মন্দ ঋণ সামলাতে নতুন মডেলে উদ্যোগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর

শামস উল ইসলাম, এমডি অগ্রণী ব্যাংক
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ব্যাংকের বিপদগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দিয়ে সহায়তা করার দৃষ্টান্ত নতুন নয়। সর্বশেষ এই চার ব্যাংকের উদ্যোগে বিপদগ্রস্ত ফারমার্স ব্যাংক (পদ্মা ব্যাংক) এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক এবার দেশের বিপদগ্রস্ত একটি শীর্ষ শিল্প গ্রুপ নাভানার বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ টেকওভার (অধিগ্রহণ) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই ঋণ অধিগ্রহণ হবে একটি নতুন মডেল বা ফরমুলা অনুযায়ী।

জানা গেছে, এই গ্রুপের চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম কামাল অসুস্থ হয়ে পড়ায় প্রতিষ্ঠানটি সংকটে পড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে গ্রুপটির মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করে। এর ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক গ্রুপটির নামে নেওয়া কিছু ঋণ টেকওভার করার আগ্রহ দেখিয়েছে। এই ঋণ অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াতে অগ্রণী ব্যাংক লিড ব্যাংক হিসেবে কাজ করছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করছে তারা। এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শামস উল ইসলাম বলেন, ‘নাভানা গ্রুপের ঋণ অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি নতুন মডেল তৈরি হবে। এই মডেল কার্যকর হলে বিপদগ্রস্ত অনেক করপোরেট গ্রুপ উপকৃত হবে। পাশাপাশি ব্যাংকও এর মধ্য দিয়ে উপকৃত হতে পারে।’

সংকটে আরও অনেক শিল্প গ্রুপ:

করোনাকালে দেশের অনেক বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বিপদে পড়েছে। এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে নাভানার ঋণ অধিগ্রহণকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক একজন গভর্নর। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে বেশ কিছু বড় শিল্প গ্রুপ বিপদে আছে। তাদের অনেকেই শ্রমিক ও কর্মচারী ছাঁটাই করা শুরু করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আর্থিক সংকটের কারণে গার্মেন্টস মালিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে বেতন দিতে না পারায় শ্রমিক ছাঁটাই করার মতো ঘটনা ঘটছে।’

বিপদগ্রস্ত করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে রক্ষায় নতুন মডেল:

নতুন এই মডেল কার্যকর হলে বিপদগ্রস্ত করপোরেট প্রতিষ্ঠানের লায়াবিলিটি সংক্রান্ত জটিলতা কেটে যাবে। এটাকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি শামস উল ইসলাম ‘ইনোভেটিভ আইডিয়া’ উল্লেখ করে বলেন, ‘গৎবাঁধা ব্যাংকিং দিয়ে এখন এগোনো যাবে না। পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমাদেরও গৎবাঁধা আইডিয়া থেকে বের হতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘নাভানা উপকৃত হলে এবং নাভানার ঋণ নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যদি লাভবান হয়, তাহলে অন্যরাও এই পথে এগোতে পারবে। বিদেশে ডিসট্রেসড লোন অধিগ্রহণের জন্য আইনগত ও কাঠামোগত ব্যবস্থা আছে। সেখানে সবকটি প্রতিষ্ঠান থেকে নানারকম ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ কাজ করে থাকে। বাংলাদেশে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছি।’ তবে নতুন আইন ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টিকে সব পক্ষের জন্যে আরও সহজ ও কম ঝুঁকিপূর্ণ করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

সূত্রপাত যেখান থেকে:

আর্থিক সংকটের কারণে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নাভানা গ্রুপকে সরকারের কাছে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। এক্ষেত্রে ‘ডেলয়েট’ নামে বিদেশি (আমেরিকান ও কানাডিয়ান) একটি অডিট ফার্ম নাভানার সব ঋণ এবং অন্য সবকিছু টেকওভার বা অধিগ্রহণের জন্য সরকারের কাছে একটি মডেল বা থিওরি উপস্থাপন করে। কিন্তু বিদেশের আদলে ডেলয়েটের দেওয়া মডেল গত দুই বছরেও কাজে লাগেনি। বর্তমানে করোনার কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। বাধ্য হয়ে গত মে মাসে কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে ১২শ’ কোটি টাকার ‘বেইল আউট’ বা আর্থিক সহায়তার আবেদন করে নাভানা।

‘ডেলয়েট’-এর প্রস্তাবে কী ছিল:

বিদেশি অডিট ফার্ম ডেলয়েটের মডেল অনুযায়ী নাভানা গ্রুপের সব ঋণ, ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং, কর্মী নিয়োগ, কর্মী ছাঁটাই যাবতীয় সব চলে আসবে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। ডেলয়েটের মডেল নিয়ে শামস উল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংকিং করতেই আমাদের হিমশিম খেতে হয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালানো ব্যাংকের জন্য কঠিন ব্যাপার। বিশেষ করে আরেক প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট দেখা, মার্কেটিং দেখার সুযোগ ব্যাংকের নেই।

ডেলয়েটের মডেল অনুযায়ী অথবা ভিন্ন কোনও ফরমুলা অনুযায়ী হলেও সরকার চায় নাভানার জন্য কিছু একটা করতে। এজন্য চলতি বছরের মার্চ মাসে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংককে ডাকা হয়। ডেলয়েটের মডেল দেখিয়ে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) বলা হয়, নাভানাকে রক্ষা করার উপায় বের করার জন্য। ব্যাংকের এমডিরা ওই বৈঠকে জানান, প্রাথমিকভাবে চার ব্যাংক মিলে প্রতিষ্ঠানটির লায়াবিলিটি বা ঋণ নিতে পারবে। তবে সব ঋণ নিতে পারবে না।’

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের এমডির বক্তব্য, ‘আমরা চার ব্যাংক শুধুমাত্র ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান তথা নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির শুধুমাত্র প্রিন্সিপাল ঋণগুলো নিতে পারবো। যদিও নাভানা চেয়েছিল তাদের সব ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যাতে নিয়ে নেয়।’ তিনি বলেন, ‘ডেলয়েটের ফরমুলাকে সামনে রেখে আমরা বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি নতুন মডেল দাঁড় করিয়েছি।’

অবশ্য নাভানা থেকে বলা হয়েছে, ওইসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদের হার ব্যাংকের সুদের চেয়ে বেশি হওয়ার কারণে এই বিপদকালীন সময়ে তারা সুদ টানতে পারছে না। নতুন মডেল অনুসরণ করলে নাভানাকে সব ঋণের বিপরীতে সুদ গুনতে হবে ৯ শতাংশ বা তারও কম। আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আসার ফলে গ্রুপটির ব্যালেন্সশিট শক্ত হবে। এতে করে গ্রুপটি চার-পাঁচ বছরের মধ্যে আইপিওর মাধ্যমে টাকা উঠাতে পারবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও তাদের ঋণ ফেরত পাবে।

সে কারণে নতুন ফরমুলা অনুযায়ী, কেবল ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শুধুমাত্র ঋণ (প্রিন্সিপাল) নেবে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। এর আগে সমুদয় সুদ শোধ করবে নাভানা। এক্ষেত্রে সরকার ঘোষিত প্যাকেজ থেকে নাভানাকে প্রয়োজনীয় ঋণ দেওয়া হতে পারে। এরই মধ্যে নাভানা ঋণের জন্য আবেদনও করেছে বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদ হার কমানোর বিষয়ে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্যোগ নেবে। এ বিষয়ে শামস উল ইসলাম উল্লেখ করেন, ‘গ্রুপটি সমুদয় সুদ পরিশোধ করার পর আমরা জামানতগুলো নিয়ে নেবো। পাশাপাশি প্রিন্সিপাল ঋণটাও নিয়ে নেবো। এর ফলে তাদের ১৫ শতাংশ হারে আর সুদ গুনতে হবে না। ৯ শতাংশের নিচে সুদ চলে আসবে। ঋণের টাকা বিতরণের জন্য একটা ভালো সময় হাতে পাবে। তাতে গ্রুপটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এর বাইরে বেসরকারি ব্যাংকের ঋণও রিসিডিউল করে নেবে।’

বিদেশি থিওরি আমাদের অর্থনীতিতে চলবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিদেশি অডিট ফার্মগুলো প্রথমেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কষ্ট কমানোর কথা বলে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাইয়ের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই মডেল চলে না। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যে কারণে আমাদের দেশের পরিবেশের সঙ্গে সহনীয় করে মডেল দাঁড় করাতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমে প্রতিষ্ঠান লে অফ করে তারপর কর্মী ছাঁটাই করতে হবে। গ্রুপকে বাঁচাতে হলে ছোট প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। এছাড়া বিকল্প কিছুই নেই। আমরা চাই না এ ধরনের একটি করপোরেট গ্রুপ শেষ হয়ে যাক।’ ফলে প্রতিষ্ঠানটি বাঁচিয়ে রাখতে তারা ছোট ইন্ডাস্ট্রিগুলো বিক্রি করে দেবে। বেসরকারি ব্যাংকের দায়দেনা শোধ করবে। অথবা পুনঃতফসিল করবে। পাশাপাশি শ্রমিক কমানোর পর আবার নতুন করে চালু করলে প্রতিষ্ঠানটি দাঁড়াতে পারবে।

মধ্যস্থতা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক:

নাভানা গ্রুপ যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেজন্য মধ্যস্থতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এরই মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এমডিদের নিয়ে আলাদা আলাদা বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নাভানার ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মিটিং হয়েছে। নন ব্যাংক তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও মিটিং হয়েছে। এখনও আলাপ-আলোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়ে আছে।’

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছুটা সুদ কমিয়ে সব মিটমাট করতে বলেছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ টেকওভার করলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্যও ভালো হবে। কারণ, প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো একটা পার্টি হারাবে, কিন্তু এই বিপদকালীন সময়ে বিতরণ করা টাকা আদায় হয়ে যাবে।’

যযঅধিগ্রহণ নিয়ে সমালোচনা:

করোনার কারণে অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে তার প্রভাব ব্যাংক খাতের ওপরও পড়ছে। এই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পক্ষে একটি করপোরেট গ্রুপের ঋণ অধিগ্রহণ কি বাস্তবিক? আবার খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচানোর চেষ্টা নিয়েও করপোরেট জগতেরই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। এমন প্রশ্নের জবাবে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘এটাকে চাপানো বলা ঠিক হবে না। আপস বলা ঠিক হবে। এটা হচ্ছে মূলত, সরকারের আগ্রহের কারণে। আর সরকারি ব্যাংক তো সরকারের আগ্রহকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। এছাড়া, এটা এখন আমাদের দায়িত্ব। এতো বড় একটি করপোরেট হাউজ বিপদে পড়েছে, আমরা সহযোগিতা করলে প্রতিষ্ঠানটি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আর আমরা তো এমনটি করিই। যেমন– ফারমার্স ব্যাংককে বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক যদি না এগোতো তাহলে অর্থনীতিতে হয়তো ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসতো।’ পড়ে যাওয়া সেই ব্যাংকটি এখন দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নাভানা গ্রুপের জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনও চাপ দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলামও। তিনি বলেন, ‘নাভানাকে এই সুবিধা কোনও চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নাভানার প্রিন্সিপাল ঋণ যদি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নিয়ে নেয় তাহলে তিন পক্ষেরই উপকার হবে।’ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদ কমানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে অল্প সুদে আমানত নিয়ে বেশি সুদে নাভানাকে ঋণ দিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে তারা সুদ না কমালে আগের মতো সরকারি ব্যাংকের আমানত সুবিধা পাবে না।’

যে কারণে নাভানার মাত্র সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকা নিচ্ছে চার ব্যাংক:

জানা গেছে, নতুন মডেলে চার ব্যাংকের এমডিরা বিকল্প ১, বিকল্প ২, বিকল্প ৩, এভাবে একটা না হলে আরেকটা ধরে ধরে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজেছেন। প্রথমে তারা ডেলয়েটের মডেল পর্যালোচনা করে আইনি কারণে বাস্তবসম্মত না হওয়ায় বাদ দিয়েছেন। তবে নতুন মডেলে প্রথমে সব ঋণ (৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকা এবং সমুদয় সুদ) নেওয়া সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে একক গ্রাহক ঋণসীমা লঙ্ঘন হয়। আর আইনেও কাভার করে না। তবে সুদ বাদ দিয়ে শুধু বেসরকারি ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ঋণ নেওয়ারও সুযোগ হয়নি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। অর্থাৎ নাভানার পেছনে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা খরচ করার মতো সক্ষমতা নেই রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের। এছাড়া আরেকটা অসুবিধা, এই ফরমুলা অনুসরণ করলে ১৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ হারে সুদ আরোপ করবেই।

তবে শুধু নন-ব্যাংক তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল ঋণ নেওয়ার সুবিধা বেশি থাকায় চার ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় এই পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছে। এই ফরমুলায় সুবিধা যেমন– শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল ঋণ নেওয়ার কারণে অল্প টাকা হওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য সহজ হয়েছে। অন্যদিকে ৫৫৪ কোটি টাকা নিলেই সব ঋণের (৫ হাজার ২৩২ কোটি) সুদ হার ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। এতে একক গ্রাহক ঋণসীমা লঙ্ঘন হয় না। আইনেও কাভার করে। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ হারের সুদ কমাতে অনেকটা বাধ্য। কিন্তু বেসরকারি ব্যাংক এক্ষেত্রে বাধ্য নয়। কারণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে অল্প সুদে আমানত নিয়ে ঋণ দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেনের সম্পর্ক ভালো।

সুদ হার কমানোর চেষ্টা:

নাভানার ওপর আরোপিত সুদ হার কমানোর জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সুদ হার বেঁধে দেওয়া বা নির্ধারণ করে দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এখনও আলোচনা পর্যায়েই আছে। সুদ হার কমানোর বিষয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও আলোচনা করছে।

এখন কোন পর্যায়ে আছে:

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের থেকে নেওয়া নাভানা গ্রুপের ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আনার বিষয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি বিভাগ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অফ সাইট সুপারভিশন বিভাগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। আইনগত দিক তারা দেখছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তিন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যাচ্ছে। তবে এখনও কোনও কিছুই  সিদ্ধান্ত আকারে আসেনি। এখনও যাচাই-বাছাই পর্যায়ে আছে।’

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী বলেন, ‘নাভানার বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। যতটুকু জানি, বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংকের এমডিদের এ নিয়ে ডেকেছিলেন। এ নিয়ে এমডিদের মিটিং হয়েছে। তবে এখনও সোনালী ব্যাংকের বোর্ডে বিষয়টি আসেনি।’

এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘নাভানার ঋণের কাজ এগোচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কয়েক দফা মিটিং হয়েছে। অন্যান্য ব্যাংকের সঙ্গেও মিটিং হয়েছে। এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়ে আছে। যাচাই-বাছাই হচ্ছে। কী নেওয়া যাবে। কতটুকু নেওয়া যাবে ইত্যাদি।’

তিনি বলেন, ‘প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট কত আছে। ইন্টারেস্ট কত আছে। এসব হিসাব চলছে। তবে ইন্টারেস্ট আমরা নেবো না। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ব্যাপারে বিধিনিষেধ আছে। এটা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও বসা হচ্ছে।’ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের আগ্রহ থেকে এটা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ঋণ অধিগ্রহণ আগেও ছিল:

ব্যাংকিং খাতে ঋণ কেনা-বেচা বা ঋণ অধিগ্রহণ আগেও ছিল। এর আগেও অনেক বড় বড় পার্টি এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে চলে এসেছে। আগে দুর্বল ব্যাংক থেকে ভালো পার্টিকে ভালো ব্যাংক ভাগিয়ে নিতো। নাভানার ক্ষেত্রে হচ্ছে কিছুটা উল্টো। অর্থাৎ পার্টিকে দুর্বল বা বিপদগ্রস্ত ভাবা হচ্ছে। একইসঙ্গে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘ভালো পার্টি কিন্তু বেসরকারি ব্যাংক যখন ঋণ দিতে পারতো না, ওই ব্যাংকের অক্ষমতা তৈরি হতো তখন ওই ব্যাংকের সব দায়-দেনা শোধ করে আমাদের কাছে চলে আসতো। আমরাও নিয়ে নিতাম। তিনি বলেন, ‘টেকওভার করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে করতে হয়। আমরা আগে নিয়ম মেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়েই করেছি। নাভানাও দায়-দেনা শোধ করে আমাদের কাছে আসছে।’

নাভানা গ্রুপের ঋণ পরিস্থিতি:

নাভানা গ্রুপ ১৭টি প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি-বেসরকারি ৩১ ব্যাংক ও ১৯টি নন-ব্যাংক তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ হাজার ২৩২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৭৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা নিয়েছে ব্যাংকগুলো থেকে। আর বাকি ৫৫৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা নিয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে।

প্রসঙ্গত, দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপের একটি নাভানা গ্রুপ। যার যাত্রা শুরু হয়েছিল বিশিষ্ট শিল্পপতি জহুরুল ইসলামের হাত ধরে। ১৯৯৬ সালে ইসলাম গ্রুপ থেকে এর নাম হয় নাভানা গ্রুপ। ১৫টি খাতে গড়ে তোলা হয় ২৭টি প্রতিষ্ঠান। ২০১৮ সাল থেকেই এই গ্রুপের আর্থিক সংকট শুরু হয়। দুটি প্রতিষ্ঠান খেলাপি হয়ে পড়ে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ঋণ শোধ দিতে পারছে না। প্রায় আট হাজার কর্মচারীর বেতন ঠিকমতো  দিতে পারছে না।

প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১০ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে লেখা একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে তাদের আর্থিক সংকট মারাত্মক রূপ নিয়েছে। চিঠিতে সরকারের ঘোষিত ৩০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ থেকে ১২শ’ কোটি টাকা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

নাভানা গ্রুপকে কোন ব্যাংক কত টাকা ঋণ দিয়েছে:

১) সাউথইস্ট ব্যাংক: ৫১০ কোটি ৭২ লাখ, ২) আইএফআইসি:  ৪৪২ কোটি ১৮ লাখ, ৩) সিটি ব্যাংক:  ৩৭৩ কোটি ৬ লাখ, ৪) অগ্রণী ব্যাংক : ৩৫৬ কোটি ৪২ লাখ, ৫) এনসিসি ব্যাংক : ২৮২ কোটি ৯৭ লাখ, ৬)  ডাচ বাংলা ব্যাংক: ২৬৬ কোটি ৪৫ লাখ, ৭) ওয়ান ব্যাংক : ২৪২ কোটি, ৮) ব্যাংক এশিয়া : ২৩৫ কোটি ৯২ লাখ, ৯) ট্রাস্ট ব্যাংক : ২৩০ কোটি ৪ লাখ, ১০) শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক: ১৯৫ কোটি ৩২ লাখ, ১১) এনআরবি ব্যাংক: ১৬৮ কোটি ২৬ লাখ, ১২) পূবালী ব্যাংক : ১৪৯ কোটি ৭৮ লাখ, ১৩) এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক: ১৪২ কোটি ৭২ লাখ, ১৪) প্রিমিয়ার ব্যাংক: ১৩৭ কোটি ২ লাখ, ১৫) উত্তরা ব্যাংক: ১৩২ কোটি ৫৩ লাখ, ১৬) মার্কেন্টাইল ব্যাংক: ১২১ কোটি ৬৫ লাখ, ১৭) মধুমতি ব্যাংক: ১০৯ কোটি ৭১ লাখ, ১৮) ঢাকা ব্যাংক ১০০ কোটি ২১ লাখ টাকা, ১৯) স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক: ৯২ কোটি ৯ লাখ, ২০) মেঘনা ব্যাংক : ৪৩ কোটি ৬৫ লাখ, ২১) ইউনিয়ন ব্যাংক: ৩৮ কোটি ৩ লাখ, ২২) আল আরাফাহ: ৩২ কোটি ২২ লাখ, ২৩) সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার: ৩২ কোটি ১২ লাখ, ২৪) মিউচুয়াল ট্রাস্ট: ৩১ কোটি ৯৯ লাখ, ২৫) এসআইবিএল: ২৮ কোটি ৪ লাখ, ২৬) ইউসিবিএল : ২৭ কোটি ১৭ লাখ, ২৭) পদ্মা ব্যাংক: ২১ কোটি ৬১ লাখ, ২৮) এক্সিম ব্যাংক: ১৯ কোটি ৩৯ লাখ, ২৯) মিডল্যান্ড ব্যাংক: ১৫ কোটি ৩৭ লাখ, ৩০) ব্র্যাক ব্যাংক : ১২ কোটি ৮৭ লাখ, ৩১) প্রাইম ব্যাংক ৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

যেসব নন-ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে নাভানা গ্রুপ:

১) উত্তরা ফাইন্যান্স:  ১২৩ কোটি ৮১ লাখ, ২) ফিনিক্স ফাইন্যান্স: ৯৮ কোটি ১২ লাখ, ৩) জিএসপি ফাইন্যান্স: ৮৪ কোটি ১৪ লাখ, ৪) ফারইস্ট ফাইন্যান্স : ৩৮ কোটি ৭ লাখ, ৫) পিপলস লিজিং: ৩৩ কোটি ৪ লাখ, ৬) বাংলাদেশ ফাইন্যান্স: ২৯ কোটি ১২ লাখ, ৭) প্রিমিয়ার লিজিং : ২৪ কোটি ৩১ লাখ, ৮) সিভিসি ফাইন্যান্স : ২২ কোটি ৫১ লাখ, ৯) ইসলামিক ফাইন্যান্স: ২২ কোটি ৫ লাখ, ১০) ফার্স্ট ফাইন্যান্স: ২০ কোটি ৯৭ লাখ, ১১) বে লিজিং: ১৮ কোটি ৭১ লাখ, ১২)  ন্যাশনাল হাউজিং: ১৭ কোটি ৯৬ লাখ, ১৩) মিডাস ফাইন্যান্স: ১৭ কোটি ৯১ লাখ, ১৪) আইডিএলসি : ৭ কোটি ১৫ লাখ, ১৫) মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স : ৫ কোটি ৮১ লাখ, ১৬) ফাস ফাইন্যান্স : ৪ কোটি ২৯ লাখ, ১৭) ইন্টারন্যাশনাল লিজিং: ৩ কোটি ৮৮ লাখ, ১৮) প্রাইম ফাইন্যান্স : ২ কোটি ৭ লাখ, ১৯) লংকা বাংলা: ৮৭ লাখ টাকা।





সম্পূর্ণ রিপোর্টটি প্রথম আলোতে পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: