পাওনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পাটকল শ্রমিকরা

পাটকলরাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকল বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এ কারণে পাওনা নিয়ে দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন পাটকল শ্রমিকরা। কবে নাগাদ পাওনা হাতে পাবেন তা নিয়ে কপালে ভাঁজ পড়েছে তাদের।

শ্রমিকদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাওনা পরিশোধ করবে সরকার। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি পেয়েও ভরসা করতে পারছেন না তারা।

পাটকল শ্রমিকরা বলছেন, ‘বছরের পর বছর ধরে আমরা মজুরি পাইনি। পাওনা নিয়ে এর আগেও এমন হাজারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পরিশোধ হয়নি। পাটকল শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য হাতে পায়নি।’

২০১৪ সালে অবসরে যাওয়া ৮ হাজার ৯৫৪ জনের পাওনা টাকাও বকেয়া রয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মূলত এ কারণেই যত দুশ্চিন্তা তাদের। একাধিক পাটকল শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খুলনার প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের শ্রমিক বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘১৩ বছর ধরে কাজ করে এসে এখন বেকার হয়ে গেলাম। পাওনাটা একসঙ্গে পেলে তো পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে বাঁচতে পারতাম। এই পাওনা কবে পাবো জানি না। একদিকে মিল বন্ধ, অন্যদিকে করোনাভাইরাস মহামারি; এ অবস্থায় অন্য কোথাও যে কাজ পাবো তারও কোনও সুযোগ নাই।’

এদিকে গত ২ জুলাই পাটকল শ্রমিকদের শতভাগ পাওনা বুঝিয়ে দিতে গণভবনে মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বৈঠকে কয়েকটি সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন ও রিমডেলিংয়ের জন্য উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা, শ্রমিকদের শতভাগ পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া, শ্রমিকদের আরও দক্ষ করতে প্রশিক্ষণ প্রদান, পরবর্তী সময়ে কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে এসব শ্রমিককে অগ্রাধিকার দেওয়া।

গত রবিবার (৫ জুলাই) রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ ঘোষণার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়– ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসর দেওয়া হবে। তাদের জন্য থাকবে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি। ১৫ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনা নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কমিটি এসব পাওনা পরিশোধের একটি রূপরেখা তৈরি করে সরকারকে দেবে। সরকার সেই রূপরেখা অনুযায়ী পাটকল শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করবে।

পাঁচ সদস্যের এই কমিটিতে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহকে সভাপতি এবং সিনিয়র সহকারী সচিব নুরউদ্দিন আল ফারুককে সদস্য সচিব করা হয়েছে। অন্য তিন সদস্য হলেন অর্থ বিভাগের যুগ্মসচিব মো. ওয়ালিদ হোসেন, অতিরিক্ত হিসাব মহানিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মমিনুল হক ভূঁইয়া এবং অতিরিক্ত উপ-মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. সাইদুর রহমান সরকার।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী জানিয়েছিলেন, মজুরি কমিশন-২০১৫ অনুযায়ী পাটকল শ্রমিকদের জুন মাসের মজুরি এ সপ্তাহে তাদের ব্যাংক হিসাবে জমা পড়বে। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গত ৫ জুলাই বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত বাংলাদেশ জুট মিলস্ করপোরেশনের (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন আলিম জুট মিল বাদে অন্যান্য পাটকল শ্রমিকদের জাতীয় মজুরি স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী জুন মাসের চার সপ্তাহের বকেয়া মজুরি পরিশোধের জন্য ৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। বরাদ্দকৃত অর্থ শ্রমিকদের নিজ নিজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চেকের মাধ্যমে দেওয়া হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।

এতকিছুর পরেও সরকার বা বিজেএমসি’র ওপর পাটকল শ্রমিকদের আস্থা ফিরছে না। তারা বলছেন, ‘শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সুবিধা দিতে সবেমাত্র কমিটি গঠন হলো। কবে নাগাদ কমিটি তাদের সুপারিশ দেবে, কবে নাগাদ সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু হবে আর কবে নাগাদ এসব সুবিধা আমরা পেতে শুরু করবো, এসব দুশ্চিন্তায় সবার মাথায় হাত।’

শ্রমিকদের মন্তব্য, ‘পাটকল শ্রমিকদের পুরো পাওনা পরিশোধে লাগবে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। সেখানে ছাড় করা হলো মাত্র ৫৮ কোটি টাকা। এভাবে ছাড় করলে কয়েক বছরেও তো আমরা পুরো পাওনা হাতে আসবে না।’

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস জানিয়েছেন, শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাটকল শ্রমিকরা এতদিন ঠিকমতো তাদের পাওনা পেতো না। এখন তাদের সব পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। যাদের পাওনা দুই লাখ টাকার কম তারা শতভাগ টাকা নগদ পাবেন। বাকিরা পাওনার ৫০ শতাংশ টাকা নগদ পাবেন এবং বাকি ৫০ শতাংশ পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে। তার কথায়, ‘শ্রমিকদের আর্থিক সুরক্ষার জন্যই ৫০ শতাংশ পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে শ্রমিকরা এখন যে অবস্থায় আছেন তার চাইতে বেশি ভালো থাকবেন।’

রাজধানীর ডেমরার লতিফ বাওয়ানি জুটমিলের শ্রমিক আব্দুল করিম মাতুব্বর মনে করেন, সরকারের উদ্যোগের কোনও ঘাটতি নেই। তারা টাকা-পয়সাও দেয় ভালো। কিন্তু দেশের পাটকলগুলোর সব সমস্যা সৃষ্টির পেছনে তিনি দায়ী করেছেন বিজেএমসি’কে। তার অভিযোগ, ‘এখানকার দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা দেশের পাট খাত পুরোটা গিলে খেয়েছে। সবশেষে খেয়ে ফেললো সরকারি পাটকলগুলো। অথচ সব দায় চাপানো হয়েছে শ্রমিকদের ঘাড়ে। শ্রমিকদের পাওনা টাকা না দিয়ে কীভাবে খাওয়া যায়, এখন সেই সুযোগ খুঁজছে তারা।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ জানিয়েছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাদের। তারা সেই দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ছাড় করা মাত্র আমরা পাটকল শ্রমিকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেবো।’

পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মন্তব্য, ‘সরকার পাটকল শ্রমিকদের ছাঁটাই করেনি, তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে মাত্র। তার দাবি, সরকার পাটকলগুলো চিরতরে বন্ধ করেনি, আধুনিকায়ন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রেখেছে। পিপিপি’র আওতায় মিলগুলো আরও ভালোভাবে চলবে। সেখানে বর্তমান শ্রমিকরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ পাবেন। আর তাদের পাওনা পুরোটাই বুঝিয়ে দেওয়া হবে, এ নিয়ে উৎকণ্ঠার কিছু নেই।’

গত ২৮ জুন ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জানান, পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় চলবে বন্ধ হওয়া পাটকলগুলো।

বিজেএমসি সূত্র জানিয়েছে, শ্রমিক মজুরি, কাঁচাপাট, যন্ত্রাংশ মেরামত, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খাত মিলিয়ে প্রতি মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় এক লাখ টাকা। কিন্তু বাজারে তা বিক্রি করা যায় ৭০ হাজার টাকায়। এ কারণে প্রতি মেট্রিক টনে সরকারকে লোকসান গুনতে হয় ৩০ হাজার টাকা। পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, গত ৪৮ বছরে সরকারকে পাট খাতে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে।

২০১৪ সাল থেকে অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের (৮ হাজার ৯৫৪ জন) প্রাপ্য সব বকেয়া, বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের (২৪ হাজার ৮৮৬ জন) প্রাপ্য বকেয়া মজুরি, শ্রমিকদের পিএফ জমা, গ্র্যাচুইটি এবং সেই সঙ্গে গ্র্যাচুইটির সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ হারে অবসায়ন সুবিধা একসঙ্গে শতভাগ পরিশোধ করা হবে। এজন্য সরকারি বাজেট থেকে বরাদ্দ থাকছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

সরকারি সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করা হলেও এসব মিল কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু রাখা হবে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা। এছাড়া এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ বা এমপিওভুক্ত করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। খুলনা অঞ্চলের পাটকলের আওতায় থাকা ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ ১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ সুবিধার আওতায় আসছে।

এদিকে পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, জেএসডি, ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) ও ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে খুলনা ও যশোরের ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ফটকে সন্তানদের নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সদস্যরা।

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: