স্বাস্থ্যের অসুখ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয় এবং তা হতেই থাকে। বাংলাদেশে এই করোনাকালে, চোখের সামনে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখছি আমরা। মাত্র কয়েকদিন আগে যা দেখেছে সবাই, সেই নাটকের মঞ্চায়ন আবার দেখলো দেশবাসী। করোনায় বিপর্যস্ত এদেশের নাগরিকরা জোবেদা খাতুন সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা তথা জিকেজি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার খবর হজম করার আগেই তাদের সামনে উপস্থিত হলো রিজেন্টের ঘটনা। কখনও বাসায় গিয়ে, কখনও নিজেদের চত্বরেই রোগীর করোনা নমুনা সংগ্রহ করতো এবং পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দিতো রিজেন্ট, যা করতো জিকেজিও। বিনামূল্যে এই কাজ করার কথা থাকলেও তারা রোগীর কাছ থেকে টাকা নিতো, আবার সরকারের কাছ থেকে বিল নিতো। 
২০১৪ সালে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়া একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ডেডিকেটেড তথা বিশেষায়িত কোভিড-১৯ হাসপাতাল হিসেবে অনুমোদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। একটা হাসপাতাল বলতে যা বোঝায় তার কিছুই নেই রিজেন্টের। কিন্তু ঠিকই অনুমোদন পেয়েছে, কোটি কোটি টাকা রোগীদের কাছে থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। সবই চলছিল তাদের মতো করেই। একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর তল্লাশি চালায় র‌্যাব, বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব কাহিনি। করোনায় সব হারানো মানুষ দেখলো মানুষের বিপদকে কত নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করতে পারে এদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্তাদের নিজেদের যেখানে নজরদারি করার কথা, সেই কাজ করলো র‌্যাব। এবং অবশেষে টনক নড়লো অধিদফতরের আমলা চিকিৎসকদের। এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. আমিনুল হাসান, যার নিজের দায়িত্ব এই নজরদারির কাজটি করা। আশ্চর্যের বিষয় এই, তার একটি ছোট নোটিশে তিনটি বানান ভুল করেছেন তিনি, যা বলে দেয় কোনও কাজই আসলে খুব মনোযোগ দিয়ে করেন না তারা। এরকম একটি হাসপাতালকে আনুমোদন দেওয়া, তার সঙ্গে চুক্তি করা প্রমাণ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরে রাজত্ব করছে এক বিশেষ চক্র, যারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য প্রশাসনকে জিম্মি করে রেখেছে। একটা গতিশীল স্বাস্থ্য প্রশাসনের দাবি হলো—সমস্যার সার্বিক পর্যালোচনা, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা ও পরিণামদর্শিতা। এই করোনাকালে আমরা এই তিন বৈশিষ্ট্যের একটিও দেখতে পাইনি এই অধিদফতর তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজে।

করোনাকালে এক বিশেষ পরিস্থিতি আমাদের সামনে উপস্থিত। কিন্তু চিরকালই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা এক আতঙ্কের নাম মানুষের কাছে। স্বাস্থ্য মানে তো আর শুধু রোগের অনুপস্থিতি নয়, স্বাস্থ্য মানে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকা। সবার জন্য স্বাস্থ্য এক দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক নাটক, কোনোকালেই যার শেষ পর্ব দেখছে না এদেশের মানুষ।

প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের কাছে সবার জন্য স্বাস্থ্যের যে অধিকার দাবি করা হচ্ছে, রাষ্ট্র সেখানে কী করছে? দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র দাবি করবে তার সীমিত সামর্থ্যে সে চেষ্টা করছে। যদিও বরাদ্দ বাজেটের এক শতাংশেরও কম, অবকাঠামো গড়ে তুলেছে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত। কিন্তু সত্যি কথা হলো, স্বাস্থ্যসেবা বলতে যা বোঝায়, সেটা দিতে পারছে না মানুষকে। অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় চরম রুগ্‌ণ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত।

প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্যের কোনও উন্নতি কি গত ৫০ বছরে হয়নি? চোখের সামনে দেখছি দেশে প্রচুর হাসপাতাল তৈরি হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে। হ্যাঁ, হয়েছে। বিল্ডিং হয়েছে। সরকারি ভবন হয়েছে, ডাক্তার নিয়োগ হয়েছে, অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, কিন্তু সেবা নিশ্চিত হয়নি। আর বেসরকারি হাসপাতাল মানেই হলো বড়লোকি চিকিৎসা, যার মূল দর্শন হলো রোগীর হৃদয় থেকে খামচে নাও তার সর্বস্ব। ব্যাপারটা কোনও বিশেষ রাজনৈতিক আমলের নয়। সব আমলে গোটা দেশজুড়ে একটাই প্রবণতা—স্বাস্থ্যসেবার জন্য মূল্য দিতে হবে বা টাকা গুনতে হবে সাধারণের সামর্থ্যের চেয়েও যা অনেক অনেক বেশি।

‘কড়ি ফেলো, নইলে চিকিৎসা নেই’—এমন ছবি গোটা দুনিয়ার নয়। হয়তো কেবলই বাংলাদেশের বা এমন কিছু দেশের। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে ১০০ টাকা খরচ হলে, তার ৭৪ টাকা যায় মানুষের পকেট থেকে। এর ফলে বাড়ে দারিদ্র্য, বাড়তি অভাব। বহু মানুষ বঞ্চিত হয় চিকিৎসা থেকে, বহু পরিবারকে সইতে হয় স্বজনের অকালমৃত্যু।

সরকারকে স্বাস্থ্যখাতে খরচ বাড়াতেই হবে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি বাড়াতে হবে স্বচ্ছতা ও স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহিতা। যারা দেশ চালাচ্ছেন সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভাবতে হবে তার ক্ষমতার কথা। আমলাতন্ত্র আর চিকিৎসক সংগঠনগুলোর পেশির দখল থেকে মুক্ত করে জনমুখী করতে হবে সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে। মানুষের প্রতি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়বদ্ধতা বাড়ানো খুবই প্রয়োজন।

যারা জিকেজি আর রিজেন্টকে ব্যবসা দেয়, যারা কোনও এক মিঠু বা জিকে শামীম নামের ঠিকাদারদের কাছে স্বাস্থ্য পরিষেবার সবকিছু তুলে দেয়, তারা জনতার শত্রু। শুধু প্রাসাদোপম হাসপাতাল তৈরি করা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা এবং কিনে ফেলে রাখাই স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন নয়।

আমরা জানি আমাদের আছে একগুচ্ছ দক্ষ, দায়বদ্ধ ও অনুপ্রাণিত চিকিৎসাকর্মী। তারাই উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার মেরুদণ্ড। কিন্তু ক্ষুদ্র রাজনৈতিক সাধনায় তারা আজ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বাইরে। জনস্বাস্থ্যে যে গুরুত্ব দেওয়া দরকার, সেটা এতকাল বুঝিনি। এখন করোনাকালে এই খাতের বেহাল দশা উন্মোচিত। জনস্বাস্থ্যকে অবহেলা করে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে ঝকঝকে করলে অবস্থা কখনও পাল্টাবে না, সুস্থ হবে না স্বাস্থ্যখাত।

লেখক: সাংবাদিক 

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: