নিরাপদ পানি, উগান্ডা আর বাংলাদেশের মিল অমিল

0

দুর্নীতির নানা কাহন এ জমানায় বেশ হাস্যরসের জন্ম দিচ্ছে। এই ধরুন, রূপপুর পরমানু বিদ্যুৎ প্রকল্পের বালিশ কেনা, ফরিদপুরে হাসপাতালের পর্দা কেনা। যে ধরণের কেনাকাটার পর্দ রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। এবার কেনাকাটার গল্প শেষে প্রশিক্ষণের নামে চলছে তুঘলুকি কারবার এমন খবর বেরিয়েছে। আর তা রূপপুর, ফরিদপুর থেকে এখন এক লাফে উগান্ডায়।

যদিও উগান্ডা নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষত ফেসবুকে কোনরূপ কটাক্ষ বা উইট অ্যান্ড হিউমার এলে অনেকেই এ দেশটির কথা উল্লেখ করেন। কেন, কি কারনে এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা জানা নেই।

এমন নানা প্রশ্ন প্রায়ই নিজের মধ্যে জাগে। তবে এবার এর বাস্তবতা উপলব্দ হলো। বিশ্বব্যাংকের এক প্রজেক্টে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও চট্রগ্রাম ওয়াসার ২৭ জন কর্মকর্তা আফ্রিকার এই দেশটিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এর জন্য ওয়াসার খরচ হচ্ছে ১১০ কোটি টাকা। মজার বিষয়, কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে দু লাখ টাকা করে হাত খরচও পেয়েছেন। বিষয়টি সোনায় সোহাগা তো বটেই। খাওয়া দাওয়া আবার কেনাকাটার অর্থ। এক ঢিলে বহু পাখি। তাও আবার নিরাপদ পানির জন্য। অথচ সার্চ ইঞ্জিন বলছে উগান্ডা অনেক সূচকেই আমাদের চেয়ে পিছিয়ে। ব্যাতিক্রম কেবল দুর্নীতিতে। সূচক বলেছে, এ দুটি দেশ দুর্নীতিতে সমানে সমান।

খ্যাতিমান রাজনীতি বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলী রিয়াজ এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, প্রায়শই ফেসবুকে অনেককেই উগান্ডার কথা লিখতে দেখেছি, কিছু ঘটলেই উগান্ডার কথা তোলা হয়েছে – আমার মনে হয়েছে এগুলো রসিকতা মাত্র; কিন্তু এখন বুঝলাম আমারই বোঝার ভুল; না হয় চট্টগ্রাম ওয়াসার ২৭ জন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ১৪ জন কর্মকর্তা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘ওয়াসার সক্ষমতা’ বাড়ানোর ‘প্রশিক্ষণে’ উগান্ডা যাবেন কেন? যেই দেশে নিরাপদ পানি পাওয়া মানুষের হার বাংলাদেশের চেয়েও কম সেখান থেকে কি ‘প্রশিক্ষণ’ নেয়ার আছে? তবে আশার বিষয় এই নিয়ে খরচ খুব বেশি হয়নি- মাত্র পাঁচ কোটি টাকা। ‘পকেট মানি’ হিসেবে প্রত্যেকে পেয়েছেন মাত্র দুই লক্ষ টাকা করে। ১ হাজার ৮শো কোটি টাকার প্রকল্প – পাঁচ কোটি টাকায় কী আসে যায়? অবশ্য এই দুই দেশের মিল এক জায়গায় আছে – কেন এই মিল সেটা এই ঘটনায়ও বোঝা গেলো।

বর্তমান সময়ে কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আর উগান্ডার মিল অমিল কোথায় তা বিভিন্ন সূচকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে মিলিয়ে দেখা চেষ্টা করছি-

উইকিপিডিয়া প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের তালিকায় এ দুটি দেশের অবস্থান সমানে সমান। ২০১৮ সালের বিশ্বব্যাপী দুর্নীতিতে সবচেয়ে খারাপ দেশগুলোর মধ্যে উগান্ডার অবস্থান ১৭৫টি দেশের মধ্যে ১৪৯ নম্বরে। অন্যদিকে বাংলাদেশেরও অবস্থান একই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের গত ২৯ জানুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে দুটি দেশেরই অবস্থান ১৩ নম্বরে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার আর উগান্ডার মাত্র ৭২৫। বাংলাদেশের পুরুষ ও নারীর গড় আয়ু যথাক্রমে ৭০ দশমিক ৮ বছর ও ৭৩ দশমিক ৮ বছর। উগান্ডার পুরুষ ও নারীর গড় আয়ু যথাক্রমে ৫৪ ও ৫৫ বছর।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিতে কাজ করা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াটার ডট ওআরজি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, উগান্ডার ৬১ শতাংশ মানুষ এখনো নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত এবং ৭৫ শতাংশের উন্নত পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা সুবিধা নেই।

প্রথম আলো প্রকাশিত নিরাপদ পানির জন্য প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়া বিষয়ক প্রতিবেদনে দুর্নীতি নামক একটি বিষয়ে দুটি দেশের মিল থাকার বিষয়টিই মনে করিয়ে দেয়। কারণ, যে দেশের ৬১ শতাংশ মানুষ এখনও নিরাপদ পানি বঞ্চিত সেখানে কোন যৌক্তিকতাই ওয়াসার কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ নিতে ছুটেছেন উগান্ডায়। রাষ্ট্রীয় টাকার নয়ছয় করা ছাড়া এর অন্য কি অর্থ থাকতে পারে এর জবাব সংশ্লিষ্টরাই ভাল দিতে পারবেন। তবে প্রতিষ্ঠানের অনেকেই এ সফরকে ‘আনন্দভ্রমণ’ নামে আখ্যা দিয়েছেন। ওয়াসার পানি দিনকে দিন অস্বাস্থ্যকর হচ্ছে। নগরবাসীর স্বাস্থ্য হানির কারণ হচ্ছে ওয়াসার পানি। একজন মিজানুর রহমান প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষের কাছে নাকাল হয়েছেন। তার জীবন এখন শঙ্কায়। যেখানে নিরাপদ পানি নাগরিকদের ন্যূন অধিকার। তা সঠিকভাবে পালন না করে তারা উল্টো প্রশিক্ষণের নামে টাকা নয়ছয় করছেন।

Loading...

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More