কে কোথায় পালিয়ে যায়…

আমীন আল রশীদব্যতিক্রম বাদ দিলে মানুষ মূলত পলায়নপর। করোনার প্রকোপ শুরুর পরে সেই পলায়নপরতার সংখ্যা বেড়েছে অনেক। প্রশ্ন হলো, মানুষ কার থেকে পালিয়ে কোথায় যায়? পালিয়ে সে কতদূর যায় বা যেতে পারে? যেখানে যায়, সেখানে তার জন্য কী অপেক্ষা করে?
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে আসা কয়েকটি খবরের দিকে নজর দেওয়া যাক।
হাসপাতাল থেকে পালিয়ে রোগীর আত্মহত্যা:
আব্দুল মান্নান খন্দকার নামে চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সেখানে তার শরীরের অবস্থার অবনতি হয় এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। পরে তিনি তার স্ত্রী মমতা খাতুনকে ফোন করে বলেন, ‘আমি আজ মরে যাচ্ছিলাম। আমি বাসায় যাবো।’ তখন স্ত্রী বললেন, ‘আস।’। এরপর থেকে মান্নানের মোবাইল ফোন বন্ধ। পরে স্বজনরা হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, মান্নান রাত ১২টার দিকে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেছেন। পরদিন সকালে রাজধানীর আদাবরে একটি কাঁঠাল গাছে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

শারীরিক কষ্ট সইতে না পেরে আব্দুল মান্নানের এই আত্মহত্যাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ও ভাবা যায়। যেহেতু এরকম ঘটনা অনেক ঘটেনি এবং মৃত ব্যক্তি এই সমাজ ও রাষ্ট্রের খুব গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন; অতএব হাসপাতালে কষ্ট হচ্ছিল বলে সেখান থেকে পালিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে তার আত্মহত্যার ঘটনাটি গণমাধ্যমেও সেভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম হয়নি। কিন্তু এই লোকটি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে; জীবনের থেকে পালিয়ে মৃত্যুর কাছে গিয়ে সমাজ-রাষ্ট্র এবং চিকিৎসাব্যবস্থাকে যে স্যাটায়ার করে গেলেন, সেটি বোঝার মুরদ আমাদের আছে কিনা, সেটিই প্রশ্ন।

পলাতক করোনা রোগী:

মেহেরপুরের গাংনীতে রেজাউল হক নামে করোনা আক্রান্ত এক ব্যক্তি বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছেন। পরিচয় গোপন করে মেহেরপুর ফিন টাওয়ার ঠিকানা দিয়ে পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন তিনি। রিপোর্ট পজিটিভ আসার পর তার বাড়ি গাংনী উপজেলার বেতবাড়িয়া গ্রামে বলে নিশ্চিত হয় প্রশাসন। পরিচয় গোপন করে কেন নমুনা দেওয়া হয়েছে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে রেজাউলের মোবাইলে ফোন দিলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। এরপরই তিনি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান।

রেজাউল হকের এই পালিয়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:

১. তিনি পরিচয় গোপন করে বা মিথ্যা ঠিকানা দিয়ে করোনা পরীক্ষা করিয়েছেন, কারণ উপসর্গ দেখে তিনি নিজেই হয়তো মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তার শরীরে করোনাভাইরাস আক্রমণ করেছে। ফলে তিনি করোনা পজিটিভ হিসেবে পরিবার ও সমাজে চিহ্নিত হতে চাননি।

২. করোনা পজিটিভ হওয়ায় তার পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছে তিনি অপরাধী বা ভয়াবহ কোনও রোগে আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন, ফলে এই আতঙ্কই তাকে পালাতে বাধ্য করেছে।

৩. করোনা পজিটিভ বলে পুলিশ তাকে বাড়িতে লকডাউন করে রাখবে এবং পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তিনি যেহেতু বাইরে বের হতে পারবেন না, ফলে তিনি এই বন্দিত্ব মেনে নিতে চাননি।

৪. শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে যদি তাকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হয়; যদি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা সম্ভব না হয় বা ভর্তি করা গেলেও পর্যাপ্ত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া না যায়, তাহলে হাসপাতালে মৃত্যুর চেয়ে পালিয়ে মুক্ত হাওয়ায় ঘুরে বেড়ানোকেই রেজাউল হয়তো শ্রেয় মনে করেছেন।

অথবা রেজাউলের এই পলায়নের পেছনে অন্য কোনও কারণও থাকতে পারে। তবে যে কারণই থাকুক না কেন, করোনা রোগীদের প্রতি পরিবার ও সমাজ যদি মানবিক আচরণ করতো; যদি করোনা রোগীদের চিকিৎসায় রাষ্ট্র সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করতো এবং মানুষের মনে এই বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি করতে পারতো যে, করোনা কোনও ভয়াবহ রোগ নয় বা করোনা রোগী কোনও অপরাধী নন; সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে সকল নাগরিক চিকিৎসা পাবেন—এই বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হলে রেজাউল হয়তো পালিয়ে যেতেন না বা পালানোর মনোবৃত্তি তার মনে তৈরি হতো না।    

করোনা সন্দেহে ফেলে গেলেন স্বজনরা:

করোনাভাইরাস সন্দেহে অসুস্থ এক বৃদ্ধাকে তার স্বজনরা বরিশালের আগৈলঝাড়া-পয়সারহাট মহাসড়কের ফুল্লশ্রী বাইপাস বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় ফেলে রেখে যায়। স্থানীয় জনতা সড়কের পাশে পড়ে থাকা বৃদ্ধাকে দেখতে পেয়ে আগৈলঝাড়া থানার ওসিকে জানান। ওসি ওই বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে আগৈলঝাড়া উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করান।

প্রশ্ন হলো, এই বৃদ্ধাকে কেন তার স্বজনরা রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে গেলেন এবং পালিয়ে তারা কোথায় গেলেন? পালাতে তো পারেননি। কারণ হাসপাতালে নেওয়ার পরে তার স্বজনদের পরিচয় জানা গেছে। এই যে একজন অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে না নিয়ে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে স্বজনরা পালিয়ে গেলেন, তারও মূল কারণ হাসপাতালে ভর্তি করতে না পারার শঙ্কা। কারণ করোনার উপসর্গ থাকলে সব হাসপাতাল ভর্তি নেয় না। আবার করোনার নমুনা পরীক্ষাও এখন এক দারুণ ভোগান্তির নাম। পরীক্ষায় ওই বৃদ্ধার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট এলে স্বভাবতই তার বাড়ি লকডাউনের প্রশ্ন আসতো এবং তাতে তার স্বজনরা কিছুদিনের জন্য গৃহবন্দি হয়ে পড়তেন। তাহলে কি স্বজনরা ভেবেছিলেন, রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে থাকতে বৃদ্ধার মৃত্যু হবে এবং বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে পুলিশ তার দাফন সম্পন্ন করবে? তার স্বজনরা কেন এতটা অমানবিক হলেন বা হতে পারলেন? পারলেন এই কারণে যে, করোনাভাইরাস তাদের মনে এক ভয়াবহ ভয় ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। অথচ এই মানুষেরাই রাস্তায় দুর্ঘটনা হলে বা নৌডুবি হলে কিংবা দুর্যোগের সময় দুর্গত মানুষের সহায়তায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু করোনা এসে এখন তাদের মন ও হৃদয়ের ভেতরে এমন এক বিপরীতমুখী অনুভূতির জন্ম দিয়েছে—যাতে মনে হচ্ছে মানুষের মধ্যে মানবিকতা বলে কিছু নেই।

বৃদ্ধের মরদেহ ঘরে রেখে পালিয়েছেন স্বজনরা:

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় করোনা উপসর্গ নিয়ে সোহরাব হোসেন হাওলাদার নামে এক বয়স্ক লোকের মৃত্যু হয়েছে। তবে মৃত ওই বৃদ্ধের মরদেহ ঘরে রেখে পালিয়েছেন স্বজনরা। মৃত সোহরাব হোসেন ঢাকায় সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করতেন। ঢাকা থেকে সর্দি-জ্বর নিয়ে বাড়িতে আসেন। অসুস্থবোধ করলে স্বজনরা তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু রাতে তিনি হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। করোনা আক্রান্ত সন্দেহে স্বজনরা তার মরদেহ ঘরে ফেলে রেখে পালিয়ে যান। মরদেহ ঘরে রেখে স্বজনরা পালিয়ে আসলে কোথায় গেলেন? গ্রাম ছেড়ে গিয়েছেন নাকি দেশ ছেড়ে? কেন তারা পালালেন? উত্তর ওই একই, আতঙ্ক।

ঢাকা ছাড়ছে মানুষ:

আমাদের বাসার পাশে রাস্তার পাশে রিপন নামে এক যুবক দর্জির কাজ করতেন। প্যান্ট কেনার পরে তার কাছ থেকেই অল্টার করাতাম। অনেকদিন ধরে তাকে দেখি না। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো রিপন গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। কারণ করোনার কারণে মার্চের পর থেকেই তার কাজকর্ম নেই। তিনি মূলত দিনমজুর। দৈনিক প্যান্ট-শার্ট ও অন্যান্য পোশাক অল্টার করে যা পয়সা পান, তা দিয়েই ঢাকায় নিজের খরচ চালানোর পরে বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাতেন। কিন্তু পুরো এপ্রিল ও মে মাস সাধারণ ছুটি এবং তারপরে জুনের ১০ তারিখ থেকে টানা ২১ দিন রাজাবাজারে লকডাউনের কারণে রিপনের শুধু পকেটের পয়সাই খরচ হয়েছে। কোনও আয় রোজগার হয়নি। তিনি জানেন না এই পরিস্থিতি কবে ভালো হবে এবং আগের মতো আর কাজ হবে কিনা। কাজ কমে গেলে ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া দিয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এলাকায় চলে গেছেন। সেখানে গিয়ে হয় দর্জির কাজ করবেন অথবা অন্য কোনও কাজ খুঁজবেন। ঢাকা শহর থেকে গত এক দুই মাসে চাকরি হারিয়ে বা কর্মহীন হয়ে এরকম অসংখ্য মানুষ ‘পালিয়ে গেছেন’, মানে ‘দেশের বাড়িতে’ চলে গেছেন। কবে পৃথিবীর অসুখ সারবে আর কবে এই মানুষগুলো আবার আয়রোজগার করতে পারবেন, সেটি এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। 

অস্বীকার করার উপায় নেই, সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া কেউই এখন আর স্বস্তিতে নেই। বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও চাকরিচ্যুতি, বেতন বন্ধ কিংবা বেতন অনিয়মিত হওয়ার আতঙ্কে আছেন। করোনার প্রভাব অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকের উপার্জনের পথ পুরোপুরি বন্ধ বা সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। 

ফলে প্রশ্ন হলো, রাজধানী ছেড়ে এই মানুষগুলো যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে? ঢাকায় না থাকলে তার হয়তো বাসা ভাড়াটা দিতে হবে না। হয়তো গ্রামে তাদের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে। কিন্তু তিনি খাবেন কী? কতজনেরই বা নগদ অথবা ব্যাংকে টাকা জমা আছে, যা দিয়ে চাল ডাল কিনবেন? চাকরিচ্যুত বা কর্মহীন এসব মানুষ কি সরকারের খাদ্য সহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আসবেন? যখন করোনার কারণে সারা পৃথিবীতেই কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে গেছেন এবং আরও বেকার হবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, তখন রাজধানী ছেড়ে যাওয়া এই মানুষগুলো জেলা বা উপজেলা শহরে অথবা গ্রামে গিয়েই বা জীবিকার বিকল্প কী তৈরি করতে পারবেন? সবাই কি কৃষক হয়ে যাবেন বা সেটি কি বাস্তবসম্মত? সবাই কি পরিবার থেকে সহায়তা পাবেন?

উনিশশ’ সাতচল্লিশে দেশভাগের সময়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলার অসংখ্য হিন্দু পরিবার ভারতে চলে গিয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘বলিল অশ্বত্থ সেই’। তিনি দেখলেন তার প্রতিবেশীরা চলে যাচ্ছে। একপর্যায়ে বরিশাল শহর ছেড়ে তাকে এবং তার পরিবারকেও কলকাতায় চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে এই যে মাইগ্রেশন, তাতে কি জীবনের কোনও রূপান্তর হয়? জীবনানন্দ নিজেই তার জবাব দিচ্ছেন—

যেখানেই যাও চলে, হয়নাকো জীবনের কোনো রূপান্তর;

এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনী ধূসর

ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাঙ্ক্ষার ঘর!

লেখক: সাংবাদিক

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: