রসাল ফলটির রসালো ইতিহাস ও খুঁটিনাটি আমচেরা বিশ্লেষণ

 

রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণলতিকারে;
শুন মোর কথা, ধনি, নিন্দ বিধাতারে।
নিদারুণ তিনি অতি;
নাহি দয়া তব প্রতি;
তেঁই ক্ষুদ্র-কায়া করি সৃজিলা তোমারে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা। আমরা কম-বেশি সবাই পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। স্মৃতিশক্তি হাতড়ে এটাও মনে পড়তে পারে যে, এখানে ‘রসাল’ মানে আম! শুধু পাঠ্যবইয়েই না, ছোটবেলা থেকেই আম মিশে আছে আমাদের প্রত্যেকের পাতে, আমের রসে ভিজে গেছে আমাদের প্রত্যেকের গায়ের জামা, অন্ততপক্ষে জামার ওপরের বিপ!

আম নিয়ে আগ্রহী? আমের চৌদ্দগুষ্টি আজ উদ্ধার করে ছাড়া হবে। আম বৃত্তান্তে আপনাকে স্বাগতম।

আমগাছের নিচে ধ্যানরত গৌতম বুদ্ধ

 

আমের ইতিহাস

আজ থেকে ছয় সাড়ে ছয় হাজার বছর আগের কথা। হতে পারে সেটা পার্বত্য চট্টগ্রাম, বা মায়ানমার বা উত্তর ভারতের কোনো জায়গা। প্রথমবারের মতো মানুষ মুখে দিলো আম। অবশ্য সেটা এই আজকের মতো সভ্য-ভব্য আম নয়। একেবারে বুনো আম।

মুখে দিয়েই তালু পর্যন্ত একেবারে রি-রি করে উঠলো। মানে, আমরা সেটা কেউই দেখিনি, কল্পনা করে নেয়া। একেবারে প্রথমদিকের সেই আঁশযুক্ত, জন্মের টক আম খেলে এমনই হবার কথা। 

কিন্তু ধীরে ধীরেই আমের কদর বাড়তে লাগলো মানুষের কাছে। ভারতবর্ষীয় বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভবের সময়ও আমের উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই যেমন মহাভারতেই আম নিয়ে মজার এক গল্প রয়েছে। সীতাকে রাবণ অপহরণ করে নিয়ে যায় লঙ্কায়। বন্দী অবস্থায় সীতাকে ফল খাওয়ানো হয়। নাম না-জানা ফল খেয়ে খুব মজা পায় সীতা। নিজের ভাগের অংশ থেকে সীতা কয়েকটা ফল রাম, লক্ষ্মণ ও হনুমানের জন্য রেখে দেয়। কদিন পর সীতার খোঁজে হনুমান গেল লঙ্কায়। ঠিক ঠিক হাজির হয় বন্দী সীতার কাছে।

সীতা হনুমানকে ওই ফল দিয়ে বলে, এগুলো তোমার, রাম ও লক্ষ্মণের জন্য। তোমরা খেয়ো।

হনুমান সেই ফলগুলো থেকে একটা ফল খেয়ে আর লোভ সামলাতে পারেনি। সব ফল একাই খেয়ে ফেলে।

ফিরে যায় সীতার কাছে। বলে, মা, আমি অপরাধ করেছি। ফলগুলো রাম ও লক্ষ্মণকে না দিয়ে একাই খেয়েছি। এখন বলো এই ফলের নাম কী? কোথায় পাওয়া যায়?

সীতা বলে, আমি তো এখানে বন্দী। কোথায় কী আছে আমি বলতে পারব না। এই ফলের কী নাম, তা-ও জানি না। তবে আশপাশেই পাওয়া যাবে হয়তো। খোঁজ করে দেখতে পারো।

হনুমান ফলের সন্ধানে বের হয়।

এত স্বাদের ফল, কী নাম এর? খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যায় আমবাগান। গাছ থেকে একটি আম খেয়ে হনুমান বুঝতে পারল, সীতার দেওয়া ফলের মতো এই ফলেরও একই রকম স্বাদ। আমগাছে উঠে হনুমান ইচ্ছেমতো খেতে থাকে আর আমের আঁটি এদিক-সেদিক ছুড়ে মারতে থাকে। কথায় বলে, হনুমানের ছুঁড়ে দেওয়া আমের আঁটি থেকেই এই ভারত উপমহাদেশে জন্ম হয়েছে আমগাছের।

পরিবারসহ শিব, একটা আমগাছের নিচে

হিন্দু ধর্ম থেকে যদি বৌদ্ধ ধর্মে চোখ ফেরাই, তাহলে জানা যায়- গৌতম বুদ্ধ এক আম বাগানের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। কোনো কোনো জায়গায় পাওয়া যায়, এক আম বাগানই তাঁকে উপহার দেয়া হয়েছিলো বিশ্রাম নেয়ার জন্য। সেই থেকে আমের পাতা বৌদ্ধ উপাসনায় এক পবিত্র জিনিস।

ভারতীয় উপমহাদেশে আমের কদর ছিলো কমবেশি সবসময়ই। তবে নথিপত্রে পাওয়া যায়, মুঘল আমল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে আমের যত্ন শুরু। এর আগে সম্রাট বাবর যখন দিল্লী জয় করে ভারতে গ্যাঁট হয়ে বসলেন, ভারতবর্ষের সবই তাঁর ভালো লাগে, খালি ফলগুলো বাদে। তাঁর তুযুক-ই-বাবুর গ্রন্থে বলেছিলেন- কী তুলনা দেবো ফারগনার (তাঁর ছেড়ে আসা রাজ্য) ফলের সাথে ভারতবর্ষের ফলের। আমি পেতে চাই আখরোট, ফুটি, তরমুজ। ভারতবর্ষের ফল মুখে দেয়ার মধ্যে কেবল আছে আম।

সম্রাট আকবর এক লক্ষ আমগাছের চারা দিয়ে বাগান করেছিলেন। সে সময়ের অন্যান্য রাজা-বাদশাহও আমের ইঞ্জিনিয়ারিঙে পৃষ্ঠ-পোষকতা করতে পেছপা হননি।

ষোড়শ শতকে পর্তুগীজদের ভারতবর্ষে আগমন এখানকার খাদ্য সংস্কৃতিতে অনেক কিছুই নতুনত্ব নিয়ে আসে। আমেও তারা বেশ কিছু নতুন জাতের উদ্ভাবন ঘটান। এমনকি, আমের যে ইংরেজি নাম ম্যাংগো, সেটার নামকরনেও পর্তুগীজদের একটা ভূমিকা আছে। ইংরেজিতে ম্যাঙ্গো শব্দটি সম্ভবত তামিল ‘ম্যানকেই’ কিংবা তামিল ‘মানগা’ শব্দ থেকে এসেছে। যখন পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ ভারতে বসতি স্থাপন করে, তারা নাম হিসেবে ‘ম্যাংগা’ শব্দটি গ্রহণ করে। আর যখন ব্রিটিশরা ১৬শ এবং ১৭শ শতকের দিকে ভারতে দক্ষিণাঞ্চলের সাথে ব্যবসা শুরু করে, তখন ইংরেজি অভিধানে ‘ম্যাংগো’ শব্দটির জন্ম। 

পারস্যের সম্রাট শাহ আব্বাসকে আপ্যায়ন করছেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর। অন্যান্য ভারতীয় ফলের মাঝে আমও দেখা যাচ্ছে।

 

বাংলাদেশে আমের সোশ্যাল স্ট্যাটাস কী?

আম জাতীয় ফল তিনটা দেশের। ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপিন্স। আর আমাদের দেশে? জাতীয় বৃক্ষ! বিশ্বের অন্য কোনো দেশে আম গাছকে জাতীয় গাছের মর্যাদা দেয়া হয়নি। ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কেন আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হলো এর কয়েকটি কারণও আছে।

  • আমগাছ দেশের সর্বত্রই সহজে জন্মায়।
  • আমাদের জাতীয় সংগীতে আমগাছের কথা আছে। ‘ও মা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে…’
  • মহান ভাষা আন্দোলনের সময় ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সমাবেশ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়।
  • ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে। এটি মেহেরপুর জেলায় অবস্থিত।
  • ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে ব্রিটিশদের হাতে পলাশীর আমবাগানে।
  • আমগাছের কাঠ দিয়ে আসবাব বানানো যায় ও জ্বালানি হিসেবেও কাজে লাগে।
  • আম সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ফল। খেতে সুস্বাদু।

 

আমের জাতপাত

বাংলাদেশে যত রকমের আম হয়, কারও প‌ক্ষেই তার সব চেনা সম্ভব নয়। এ দেশে একসময় দেশি জাতের প্রচুর আম ছিল। একসময় গবেষকেরা ভারতীয় উপমহাদেশে আমের প্রায় ১ হাজার ৬৫০টি জাতের একটা তালিকা তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। এ দেশে আমের সেই বৈচিত্র্যভরা ভুবনে এখনও রয়েছে হাজারখানেক জাতের আম। ঢাকায় ২০১৯ সালে হওয়া জাতীয় ফল প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছিল আমের ৭৫টি জাত। প্রতিটি জাতের আমের চেহারা, রং, রূপ, ঘ্রাণ, স্বাদ, মিষ্টতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য আলাদা। এখনও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় গেলে অনেক স্থানীয় জাতের আমের দেখা পাওয়া যায়। ভোলাহাট ও গোমস্তাপুরেও আছে অনেক জাতের দেশি আম। ক্ষীরভোগ, মোহনভোগ, রাজভোগ, রানিভোগ, রানিপছন্দ, সিন্দুরা, সুবর্ণরেখা, কুয়াপাহাড়ি, নাক ফজলি, ফজলি, চিনি ফজলি, সুরমাই ফজলি, চিনি মিছরি, জগৎমোহিনী, রাখালভোগ, রাঙ্গাগুড়ি, গোবিন্দভোগ, তোতাপুরি, মিশ্রিকান্ত, জালিবান্ধা, বোম্বাই, ভুতো বোম্বাই, পাহাড়িয়া, গোলাপখাস, কাকাতুয়া, দাদভোগ, চম্পা, সূর্যপুরি, কাঁচামিঠা, কলামোচা, শীতলপাটি, লক্ষ্মণভোগ, গোলাপবাস, কিষাণভোগ, বান্দিগুড়ি, কুয়াপাহারী, রাংগোয়াই, আশ্বিনা, ভাদুরিগুটি, বনখাসা বউ ফুসলানি, ক্ষীরমন, দুধসর, রঙভিলা, পারিজা, আনোয়ারা, দিলশাদ, আম্রপালি, মল্লিকা, বেগমবাহার, পূজারিভোগ, পলকপুরি, রাজলক্ষ্মী, দুধকুমারী, শ্যামলতা, খাট্টাশে, জাওনা, দমমিছরি, মিছরি মালা, মিছরিবসন্ত, মেসোভুলানী, আনোয়ারা, ফুনিয়া, গোলাপবাস, বাতাসাভোগ, ইটাকালি, গোল্লাছুট, পোল্লাদাগী, মোহনবাঁশি, পরানভোগ, বিড়া, ভারতী, বাদশাপছন্দ, বেগমপছন্দ, রাজাপছন্দ, বনখাসা, বাগানপল্লি, কালিগুটি, পাকচারা, কালিয়াভোগ, দুধসর, কোহিতুর, কালিগুলি, হাঁড়িভাঙা, বালিশা ইত্যাদি জাতের আম এখনও দেখা যায়।

তবে সন্দেহ নেই, এর মাঝে গোপালভোগ, হীমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি এসব আমের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বি।

 

আমের দিনপঞ্জি

আম তো আম-ই, অতশত জাতপাত চেনার দরকার কী? দরকার এ জন্য যে, সব জাতের আম একই সময়ে পাকে না। তাই জাতগুলো চেনা থাকলে ও কোন অঞ্চলে কোন জাতের আম কখন পাকে, তা জানা থাকলে জোর করে পাকানো আবাত্তি আম কিনে আমের আসল স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হবে না। গোপালভোগ আম পাকা শুরু হয় ২০ মে থেকে। বিশেষ করে নাটোর ও রাজশাহীতে এ সময় থেকে ভালো পাকা গোপালভোগ পাওয়া যায়। লক্ষ্মণভোগ ২৫ মে ও ক্ষীরশাপাতি আম পাকা শুরু হয় ২৮ মে থেকে। ৬ জুন থেকে পাকতে শুরু করে ল্যাংড়া। ফজলি, সুরমা ফজলি, চিনি ফজলি, নাক ফজলি ইত্যাদি জাত পাকা শুরু হয় ১৬ জুন থেকে। এরপর পাকে আম্রপালি, ২০ জুনের পর থেকে ভালো পাকা আম্রপালি আম পাওয়া যায়। আশ্বিনা আম পাকে ১ জুলাই থেকে। বিভিন্ন জাতের আম কেনার সময় পরিপক্বতার এই সময়গুলো খেয়াল রাখলে ভালো পাকা আম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান জেলার পাহাড়ের আমবাগানে প্রধানত আম্রপালি ও রাংগোয়াই জাতের আম হয়। পাহাড়ে এসব জাতের আম একটু আগে পাকে। স্থান ও আবহাওয়ার কারণে কোনো কোনো জাতের আম পাকার সময় কিছুটা হেরফের হতে পারে।

 

আম খাবার একটি ‘ভদ্র’ ও একটি ‘দুষ্টু’ রেসিপি

আম তো খেয়েছেন অনেকভাবেই। এবার একটা ভদ্র আর একটা দুষ্টু রেসিপি দেয়া যাক। একেবারে সহজ রেসিপি।

রসালো পাকা আম খাবার সময় তাতে গুঁড়ো দুধ ছিটিয়ে নিন। এইবার মুখে নিন। দুধের বিশুদ্ধতা আর আমের অমৃত স্বাদ একই সাথে পাবেন। এই স্বাদের খুব কদর করতেন অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী। পরিচিত অনেক মানুষকেই এভাবে আম খেতে তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন। 

এইবার দুষ্টু রেসিপি। উৎকৃষ্ট বাছাই করা আম থেকে রস সংগ্রহ করুন। সাথে নিন ওয়াইন। মিলিয়ে নিন গোলাপের পাঁপড়ি। পরিবেশন করুন উত্তম পাত্রে। কী? খারাপ বলছেন? গর্দান সামলে স্যার! এই জিনিস পরিবেশন করতেন স্বয়ং নূর জাহান। সম্রাট জাহাঙ্গীরকে। 

 

আমের বেশকিছু জাতের মজার নামকরণ

আমাদের খুব চেনা যে আমগুলো, তাঁর অনেকগুলির নামকরণের পিছেই আছে মজার ইতিহাস। এর কোনো কোনটা ঐতিহাসিক সত্য, কোনোটার সাথে আছে সত্যি-মিথ্যের মিশেল। চলুন শুনি।

ফজলি আম: জানা যায়, ১৮০০ সালে ফজলি বিবি নামে এক বৃদ্ধা বাস করতেন গৌড়ের এক প্রাচীন কুঠিতে। তার বাড়ির উঠানেই ছিল একটি আমগাছ। তিনি গাছটির খুব যত্ন নিতেন। ওই এলাকার কালেক্টর রাজভেনশ একবার বৃদ্ধার ঘরের কাছে শিবির স্থাপন করেন। তার আগমনের খবর পেয়ে বৃদ্ধা সেই আম নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন।

রাজভেনশ সেই আম খেয়ে খুবই মজা পান। সেই আমের নাম জানতে চান। কিন্তু ইংরেজি না বুঝে শুধু ‘নেম’ শুনেই নিজের নাম বলে দেন ফজলি বিবি। সেই থেকেই এই আমের নাম ‘ফজলি’।

ল্যাংড়া আম: মোঘল আমলে দ্বারভাঙায় এই আম চাষ শুরু হয়। কিন্তু তখন কেউ এর নাম নিয়ে মাথা ঘামাননি। পরে আঠারো শতকে এক ফকির খুব সুস্বাদু এই আমের চাষ করেন। সেই ফকিরের পায়ে একটু সমস্যা ছিল। সেই থেকেই নাকি ওই আমের নাম হয়ে যায় ‘ল্যাংড়া’।

গোপালভোগ আম: ইংরেজ বাজারে নরহাট্টার গোপাল নামের এক ব্যক্তি চাষ করেন এ আম। সেই থেকে গোপাল চাষির নামে গোপালভোগের উৎপত্তি হয়।

গোলাপখাস আম: গন্ধের জন্য বিখ্যাত এ আম। গোলাপ ফুলের মতো গন্ধ থাকায় এই আমকে গোপালখাস নামে ডাকা শুরু হয়। প্রাচীন বাংলার আমগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এর গায়ে গোলাপের রঙের লালচে আভা রয়েছে।

গুটি আম: ছোট এক ধরনের আম খেয়ে সেই আঁটি নিজের বাগানে পুঁতেছিলেন মালদহের এক দরিদ্র কৃষক। সেই আঁটি থেকেই জন্ম নিয়েছিল একটি আম গাছ। কাঁচা অবস্থায় টক। কিন্তু পাকলে খুব মিষ্টি। আঁটি বা গুটি থেকে গাছটি জন্মায় বলে আমের নামও হয়ে যায় ‘গুটি’।

 

সব বুঝলাম, কিন্তু আম কেন খাবো? (সাত খণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা কার বাপ)

আমের অনেক পুষ্টিগুণ রয়েছে। উচ্চমাত্রার চিনি, ভিটামিন ‘এ’ এবং ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে এই ফলে। আমে রয়েছে ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্স। এই ভিটামিন শরীরের স্নায়ুগুলোতে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। শরীরকে রাখে সতেজ। ঘুম আসতে সাহায্য করে। আমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আঁশ। আঁশ-জাতীয় ফল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, মুখের ব্রণ প্রতিরোধ করে। চিকিৎসকদের মতে, আমে খনিজ লবণের উপস্থিতিও রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। দাঁত, নখ, চুল, মজবুত করার জন্য আমের খনিজ লবণ উপকারী ভূমিকা পালন করে। বুদ্ধি ও শরীরের শক্তি বাড়ানোর জন্য আম ভীষণ জরুরি ফল।

তবে, বেশি বেশি কোনো জিনিসই ভালো না। বেশি আম খেলে মুটিয়ে যেতে পারেন। রক্তে শর্করা থাকলেও সাবধান। কিডনি রোগে আম বুঝেশুনে। আর, ফেসবুকে আম খাওয়া নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়ে ফেললে শবনম ফারিয়ার মতো বিপদেও পড়তে পারেন!

 

শেষের আগে আম নিয়ে চার ফালি কৌতুক

এ বঙ্গভূমিতে সারা বছরই কত ফল আসে-যায়। কিন্তু আম নিয়ে আম জনতার আগ্রহের শেষ হয় না। এই বঙ্গভূমিতে আম ছাড়া ফলাহার হয় না। তেমনি জৈষ্ঠ্য মাস এলে জামাইকে আম না খাওয়ালে শ্বশুরের যে আর মান থাকে না!

আম আমাদের জীবনেরই অংশ। তাই আম নিয়ে কৌতুকেরও শেষ নেই। আমের মতোই রসালো চার ফালি কৌতুক পড়ে শেষ করুন-

১# কাকা: কিরে কেষ্ট তুই গাছে উঠে আম চুরি করছিস?

কেষ্ট: না কাকা, আম গুলা পইড়া গেছিল, আমি গাছের ডালের সাথে জোড়া লাগাইতেছি।

কাকা: চালাকি! তোর বাবাকে এখনই বলতেছি, ছেলেটাকে চোর বানিয়েছে।

কেষ্ট: বাবা তো পাশের গাছে আম জোড়া লাগাইতেছে, কাকা।

২# বাদশাহ আকবর বীরবলকে খুব ভালবাসতেন৷ একবার শাহী খানাপিনার সময় তিনি বীরবলকে আরো খেতে বললেন। কিন্তু বীরবল বললেন, পেটে আর জায়গা নেই হুজুর৷

একটু পরে রাজকীয় খানসামা এসে বীরবলের প্লেটে রাখলো লোভনীয় আম৷ বীরবল গপাগপ সব আম খেয়ে ফেললেন। বাদশাহ গেলেন রেগে!বীরবলকে জিজ্ঞেস করলেন- এখন আম খাচ্ছো, একটু আগে মজাদার কোফতা কালিয়া খেলে না কেন?

বীরবল বাদশাহকে বললেন, হুজুর রাস্তায় যখন খুব ভিড় থাকে তখন সেই পথ দিয়ে আপনি গেলে সবাই সরে গিয়ে আপনাকে জায়গা করে দেন৷ আপনি যে রকম আমাদের রাজা, আমও সে রকম ফলের রাজা৷ আপনাকে যে রকম আমরা রাস্তায় ছেড়ে দিই৷ পেটও সেই রকম আমকে দেখে রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে৷ তাই আমি আম খেতে পেরেছি৷

৩# একদিন শিক্ষক বললেন, আমি ক্লাসে তোমাদের বলেছি, কখন আমের চারা লাগাতে হয়, কীভাবে তার যত্ন নিতে হয়। এবার বলো তো, কখন আম পাড়তে হয়? ছাত্রের উত্তর, আমগাছের মালিক ঘুমিয়ে থাকলে, স্যার।

৪# মীর্জা গালিবের এক বন্ধু আম পছন্দ করে না। গালিব বললেন, আম খাও না কেন? বন্ধু উত্তর দিলেন, আমি আম খাবো কেন? পাগলেও আম খায় না। গালিব বললেন, আরে পাগল বলেই তো আম খায় না।

বন্ধু আমতা আমতা করে আম খাওয়া শুরু করলেন।

এই বঙ্গভূমির পাগলেরাও আম খেতে ভুল করে না। তাই বঙ্গসন্তানদের জীবনে আমের চেয়ে বড় সত্য আর নাই। 

কবি গালিবকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, কী খেতে চান আপনি সবসময়? 

গালিব বলেছিলেন- মিষ্টি আম। অনেক অনেক বেশি পরিমাণে। 

কবি গালিব, আপনার মনোষ্কামনা হোক প্রতিটি বাঙালীর ললাট লিখন। পৃথিবীর সবার জীবন আমময় হোক। গ্রীষ্মকালে প্রত্যেকের থাল সিক্ত হয়ে উঠুক আমের রসে ।





আরও পড়ুন eআরকিতে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: