এবারের বাজেট অধিবেশন চলেছে ভিন্নধর্মী পরিকল্পনায়: বাংলা ট্রিবিউনকে স্পিকার

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীএবার বাজেট অধিবেশন সংক্ষিপ্ত হলেও করোনাকালের বিবেচনায় এটাকে দীর্ঘ অধিবেশন বলছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি জানান, করোনা সংক্রমণের বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ পরিকল্পনায় এ অধিবেশন পরিচালনা করা হয়েছে। স্পিকার জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার অধিবেশন পরিচালনা করা কঠিন ছিল। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সতর্কতার সঙ্গে অধিবেশন চালাতে হয়েছে। সবার সহযোগিতা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার কারণে অধিবেশনটা ভালোভাবে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। অধিবেশনে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন বলেও স্পিকার জানান। চলতি বাজেট অধিবেশন নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে টেলিফোনে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

করোনা সংক্রমণজনিত বৈশ্বিক মহামারির মধ্যে এবার বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। গত ৩০ জুন সংসদে ২০২০-২১ অর্থ বছরের বাজেট পাস হয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সংসদের বৈঠক ডেকে এ বাজেট পাস করতে হয়েছে। এবার সাধারণ বাজেটের ওপর আলোচনা হয়েছে চার ঘণ্টা ২০ মিনিটের মতো। এ ছাড়া সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা হয়েছে এক ঘণ্টা। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রীসহ বাজেটের ওপর মোট বক্তব্য দিয়েছেন ২১ জন সংসদ সদস্য। তাদের মধ্যে সম্পূরক বাজেটের ওপর ছয় জন এবং সাধারণ বাজেটের ওপর ১৫ জন বক্তব্য দিয়েছেন। অবশ্য তাদের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের এবং বিএনপির হারুনুর রশীদ উভয় বাজেটের ওপর বক্তব্য দিয়েছেন। এ পর্যন্ত সাতটি কার্যদিবস সংসদ চলেছে। আরও দুটি কার্যদিবস চলার পর আগামী ৯ জুলাই অধিবেশন শেষ হবে।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বাজেট অধিবেশন পরিচালনা প্রশ্নে স্পিকার বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের মধ্যে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে এ ধরনের একটি অধিবেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের ভিন্নধর্মী একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়েছে। অন্যান্য সময়ে যতটা সহজভাবে অধিবেশন পরিচালনা করা যায়, বর্তমান বাস্তবতায় এবার তা সম্ভব ছিল না। এই অধিবেশনে আমরা ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট পাস করতে পেরেছি। এজন্য মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।’

বাজেট অধিবেশন তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ প্রশ্নে শিরীন শারমিন বলেন, ‘এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে এবারের বাজেট অধিবেশনটা অন্যান্য বাজেট অধিবেশনের তুলনায় খুবই সংক্ষিপ্ত। তবে, করোনার তুলনায় এটা ছিল দীর্ঘ অধিবেশন। বাজেট অধিবেশনে দুটো ভাগ থাকে। প্রথমে সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা এবং সেটা পাস করতে হয়। এরপর মূল বাজেট পাস হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিল থাকে, যেটা অবশ্যই পাস করতে হয়। যেমন অর্থ বিল ও নির্দিষ্টকরণ বিল। এই বিলগুলো উত্থাপন হয়। দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি হয়। আমরা এ সবগুলো প্রক্রিয়া শেষ করে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বাজেট পাস করতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘সব সদস্য কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা বৈঠকগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের উপস্থিতি, অংশগ্রহণ জরুরি ছিল। তাদের সুরক্ষার জন্য বিষয়টি আমরা সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছি। তাদের সুরক্ষার নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সব ধরনের পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু এর পাশাপাশি কার্যপ্রণালি বিধি এবং সংবিধানে যেভাবে বিবৃত আছে, সেইভাবে আমাদের বাজেট পাসের প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে হয়েছে।’

করোনাঝুঁকির কারণে পরিকল্পনার তুলনায় অধিবেশন আরও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, ‘বাজেটের ওপর আরও বেশি আলোচনার সুযোগ সম্প্রসারিত করতে পারলে ভালো লাগতো। আমাদের সেটার ইচ্ছা এবং পরিকল্পনাও ছিল। ইচ্ছা ছিল বাজেটের ওপর আরও কয়েকদিন আলোচনার। কিন্তু অধিবেশন শুরুর পর সম্পূরক বাজেট পাশের বিষয় আসতে না আসতেই দেখা গেলো অনেকের আক্রান্তের তথ্য আসছে। সেই বাস্তবতায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় নিয়ে অধিবেশনটাকে আরও একটু সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে।’

অধিবেশন পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সার্বিক সহযোগিতা পেয়েছেন উল্লেখ করে শিরীন শারমিন বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদ নেতা শেখ হাসিনা দৃঢ় মনোবলে এগিয়ে যেতে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। অর্থবছরের বাজেট সংসদ থেকে পাস করাতে হয়। প্রথম থেকেই তিনি উৎসাহিত করেছেন, সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে যাতে জুনে এই অধিবেশনটা আমরা করতে পারি। বাজেটটা যাতে সংসদে পাস করতে পারি। প্রধানমন্ত্রীর গাইডলাইন এবং তিনি যে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন তা খুবই কার্যকর ছিল। তার সহযোগিতা ও নির্দেশনায় আমরা নির্বিঘ্নে বাজেট পাস করতে পেরেছি। তিনি সার্বক্ষণিক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। সব বিষয়ে তার সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ ছিল। আমরা সেইভাবে করেছি।’

রোস্টার ভিত্তিতে সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হুইপরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, ‘চিফ হুইপসহ অন্যান্য হুইপরা অধিবেশনটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে খুবই পরিশ্রম করেছেন। কোন দিনের বৈঠকে কোন কোন সদস্য অংশ নেবেন তাদের তালিকা করে উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিল একজন সদস্যকে গড়ে তিন দিন করে বৈঠকে উপস্থিতির সুযোগ দেওয়ার। যাতে সবাই সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। কিন্তু সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় মাঝখানে অধিবেশন আরও ছোট করে দেওয়ার কারণেই অনেককে সেই সুযোগ দিতে পারিনি। তারপরও আমাদের প্রতিটি বৈঠকে গড়ে ৮০-৯০ সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। বেশির ভাগ মন্ত্রীই উপস্থিত থেকে তাদের মঞ্জুরি দাবিগুলো করেছেন। শুধু যারা কোভিড আক্রান্ত তারা আসতে পারেননি।’

বৈঠকে স্বাস্থ্যবিধি মানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের গাইডলাইন অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করেছি। মাস্ক, গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজ করাসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, অধিবেশনে সংসদ সদস্যের সঙ্গে অন্য কেউ আসতে পারবেন না। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নমুনা পরীক্ষা করিয়েছি। একটা পর্যায়ে আক্রান্ত দেখা যায়, তখন আমরা সংসদ সদস্যদের নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। তারা স্বেচ্ছায় নিজেদের আগ্রহে নমুনা পরীক্ষা করিয়েছেন। প্রায় একশর মতো সংসদ সদস্য সংসদের মেডিক্যাল সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়েছেন।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘সংসদের সবগুলো বৈঠকে সংসদ নেতা ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাজেট পেশের দিন উপস্থিত ছিলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। সঙ্গত কারণেই তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।’

সকালে অধিবেশন চালানোর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘বিকালে অধিবেশন পরিচালনা করলে একাধিকবার বিরতির প্রয়োজন পড়ে। এতে করে সংসদ সদস্যরা লবিতে বা অন্য কোথাও বসবেন। এতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ সৃষ্টি হতে পারে। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমরা সকালে অধিবেশন চালিয়েছি। সকালে শুরু করে কোনও বিরতি ছাড়াই একটানা অধিবেশন শেষ করেছি।’

অধিবেশনে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন বলে মন্তব্য করে শিরীন শারমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাজেট অধিবেশনের কাজ অনেক ভিন্নধর্মী। ছাঁটাই প্রস্তাব-সংশোধনীর অনেক কিছুই ব্যাকগ্রাউন্ডে কর্মকর্তাদের করতে হয়। এগুলো তারা সুন্দর ও সুচারুরূপে করেছেন। যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তাদেরও কঠোর ও সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কোনোভাবে করোনা পজিটিভ কেউ যাতে সংসদ ভবন বা অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করতে না পারেন সেটা নিশ্চিত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা তারা করেছেন। সার্বিক ব্যবস্থাপনার কারণে আমরা এই পর্যন্ত অধিবেশনটা ভালোভাবে চালিয়ে নিয়েছি। সামনে আরও দুটি কার্যদিবস রয়েছে। ৮ ও ৯ জুলাই অধিবেশন বসবে। আশা করছি, একইভাবে এটা সম্পন্ন করতে সক্ষম হবো।’

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: