করোনাকালে বিলুপ্তির হুমকিতে বেনারসি বয়নশিল্প

এ দৃশ্য এখন কমবেশি সব বয়ন এলাকার। জ্যাকার্ড নকশার ছিদ্র করা চিকন বোর্ডগুলো ওপর থেকে ঝুলছে। সেগুলোতে ঝুল জমেছে। ছিদ্রগুলোর ভেতর দিয়ে তাঁতে নেমে আসার সুতার সারিতে বাসা বেঁধেছে মাকড়সা। কাপড় বোনার কেউ নেই। হঠাৎ দেখলে স্থিরচিত্র মনে হতে পারে। করোনাকাল যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই তাঁতঘরগুলো আদপেই স্থিরচিত্রে পরিণত হচ্ছে। বাড়ছে অভাব, তাল মিলিয়ে বাড়ছে সংস্থান হারানো মানুষের মিছিল।

বয়নশিল্পীরাও আছেন এই কাতারে। ইতিমধ্যে চাকরি হারানোর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে মিরপুর বেনারসিপল্লির কোনো কোনো কারখানায় অভ্যাসবশত বয়নশিল্পীরা আসেন। তাঁতে বসেন। কাপড় বোনেন। মাকুর চলনের শব্দ হয়তো কিছুটা সময়ের জন্য ভুলিয়ে রাখে ক্রমবর্ধমান সংকট। কিন্তু খটাখট আওয়াজ যখন থামে, তখন অবাধ্য পেট চাগাড় দিয়ে ওঠে। নিজের ক্ষুধা-তৃষ্ণা পরক্ষণে গৌণ হয়ে যায় বাসায় রেখে আসা সন্তানের কথা মনে করে। বিক্রি হবে না জেনেও এভাবেই তাঁতে বসছেন বেনারসিপল্লির কয়েকজন বয়নশিল্পী। নিয়ম করে প্রতিদিন কারখানার মালিকও আসেন। কিন্তু এই দুর্যোগে তিনিও অসহায়। পরিস্থিতি এমন যে, তাঁর নিজের বাড়িতেই হাঁড়ি চড়ে না।

২০০০ সালের হিসাব অনুযায়ী, ৬ হাজারের বেশি তাঁত ছিল মিরপুরে। সেখান থেকে কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে অনেক আগেই। কারণ আর কিছুই নয়, স্রেফ অবহেলা। আর এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর অন্যের জিনিস বিক্রি করে বেশি মুনাফা করার নিয়ত লোভ। এখনো যে তাঁত আছে তার মধ্যে চলছে গুটিকয়। তাও বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ সেই মার্চ থেকে ব্যবসা নেই। শাড়ি যা বোনা হয়েছে, তা কারিগর কিংবা মহাজনের কাছেই থেকে গেছে। দোকানমালিকেরা নিচ্ছেন না।

বেনারসি বয়ন করছেন আরমান। করোনা সংক্রমণের প্রায় আড়াই মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সহায়তা বেনারসিপল্লির বয়নশিল্পী ও বয়নসংশ্লিষ্ট কারিগরেরা পাননি। ছবি: সৈয়দ আশরাফুল আলমবেনারসিপল্লিতে এই মুহূর্তে দোকানের সংখ্যা ১০৮। নিয়ম করে প্রতিদিন খোলা হলেও খদ্দের নেই। কারণ, বেনারসির সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বিয়ে না থাকলে বেনারসির বিক্রিও নেই। এর মধ্যে ঘরোয়াভাবে দু-একটা বিয়ে হয়তো হচ্ছে। তাঁরা শাড়ি কিনতে আসছেন। কিন্তু দোকান খোলা রাখার খরচ উঠছে না। জানাচ্ছিলেন মাহমুদা সিল্ক হাউসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আসির। তিনি বললেন, তিন মাসের ওপর বেচাকেনা নেই। এত দিন কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়েছে। এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। বেশির ভাগ দোকানই তাই কর্মচারী অর্ধেক করে ফেলেছে। আর যাঁরা আছেন, তাঁদেরও কম বেতনে রাখা হচ্ছে।

এক কথায়, মানবেতর জীবন যাপন করছেন বেনারসিপল্লিতে বয়নশিল্পের সঙ্গে জড়িত লোকজন। কেবল বয়নশিল্পীই নয়, এখানে আছে জ্যাকার্ড নকশার কারিগর, মেশিন তৈরির কারিগর, রঞ্জকশিল্পী, মাকু তৈরির কারিগর, টানা ও বানা তৈরির কারিগর, শাড়ি তৈরির পর সুতা কাটার কারিগর। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা হাজারের ওপর।

তবে তাঁত বোর্ডের মিরপুর বেসিক সেন্টারের লিয়াজোঁ অফিসার মো. সালাউদ্দিন মিরপুরের তিনটি তাঁতি সমিতির সহায়তায় একটি তালিকা তৈরি করে সাহায্যের আবেদনসহ ২০ এপ্রিল জেলা প্রশাসককে এবং ২৮ এপ্রিল উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের কাছে পাঠান। এই তালিকায় ক্ষতিগ্রস্ত ৮৮৬ জন বয়নশিল্পীর কথা উল্লেখ করা হয়। যদিও চিঠিতে মোট ৩ হাজার ৮ জন বয়নশিল্পী এবং ২ হাজার ২৬৯টি তাঁত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

অবশ্য পুরস্কারপ্রাপ্ত বয়নশিল্পী মোহাম্মদ রফিক জানান, ওই তালিকা তাড়াহুড়া করে করায় সবার নাম অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। আর ক্ষতিগ্রস্ত ৮৮৬ জনের সবাই বয়নশিল্পী নন বরং বয়নের আগে ও পরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত কারিগরেরাও আছেন। একইভাবে মিরপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকেও ২০ এপ্রিল একটি চিঠি দেন মো. সালাউদ্দিন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঈদের আগে কেবল ওই ওয়ার্ডের বয়নশিল্পী ও অন্য কারিগরেরা কিছু খাদ্যসামগ্রী পেয়েছেন বলে জানান মোহম্মদ রফিক।

জেলা প্রশাসক এবং মেয়রের কাছে লেখা চিঠির সঙ্গে তালিকা প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্দশায় থাকা বয়নশিল্পী ও অন্য কারিগরদের ত্রাণ সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি সুলভ মূল্যে চাল প্রাপ্তির জন্য রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা।

করোনার মধ্যেও মিরপুর বেনারসিপল্লির কোনো কোনো কারখানায় অভ্যাসবশত বয়নশিল্পীরা আসেন। ছবি: সৈয়দ আশরাফুল আলমএরপর প্রায় আড়াই মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সহায়তা বেনারসিপল্লির বয়নশিল্পী ও বয়নসংশ্লিষ্ট কারিগরেরা পাননি। একাধিকবার বিষয়টি তাঁত বোর্ডের সচিবকে অবগত করা হলেও তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান।

৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণের তথ্য প্রকাশ পায়। এরও আগে থেকে মানুষ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনায় ব্যস্ত থেকেছে। বিলাসসামগ্রীর দিকে ঝোঁকেনি। এর ফলে দেশীয় ফ্যাশন শিল্প খাত ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই শিল্প খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর একটি বয়নশিল্পও সমান ক্ষতির মুখে পড়েছে।

মিরপুর বেনারসি বয়নশিল্পী ও অন্য কারিগরেরা জীবনধারণের তাগিদে তাঁত ফেলে বেছে নিয়েছেন নানা ধরনের পেশা। কেউ সবজি বা ফল বিক্রি করছেন। কেউ ভ্যান ও রিকশা চালাচ্ছেন। আর এসব যাঁরা করতে পারছেন না, তাঁদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। বাড়িভাড়া বাকি পড়েছে ৩-৪ মাসের। এমনকি এঁদের গ্রামে চলেও যাওয়ারও উপায় নেই। কারণ এঁদের তো যাওয়ার সেই জায়গাটাও নেই।

বেনারসি বয়নশিল্প বস্তুত বিশ শতকের চল্লিশ-সত্তরের দশকে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশে অভিযোজিত হয়েছে। পরিযায়ী পরিস্থিতি থেকে এই শিল্প এ মাটিরই হয়ে গেছে। কালে কালে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করলেও নিজেরা সেটা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। অনেকেরই মনে থাকার কথা, ২০০২ সালে বলিউডে নির্মিত ছবি ‘দেবদাস’-এর জন্য পরিচালক সঞ্জয়লীলা বনসালি ঢাকা থেকে দুটো শাড়ি বানিয়ে নিয়েছিলেন। দুটোই বেনারসি। একেকটির ওজন ছিল ১৫ কেজি করে। বেনারসের দ্বারস্থ না হয়ে তিনি ঢাকামুখী হয়েছিলেন। অথচ এসব ঘটনা আমরা মনে রাখিনি। এমনকি ব্র্যান্ডিংয়েও ব্যবহার করিনি। একটা সময় ছিল যখন ঢাকায় তৈরি বেনারসিতে বোনার সময় ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ লেখা হতো। আর সেসব শাড়ি ভারতীয় বলে ঢাকাতেই বিক্রি হতো। অথচ দিন বদলে গেছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য। বর্তমানে মেশিনে তৈরি ভারতীয় শাড়ি নিয়ে এসে এখানে দেদার বিক্রি করে কম শ্রমে অধিক মুনাফার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মিরপুরের বেনারসিপল্লির কোনো উন্নয়ন হয়নি। তাঁতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সুতার দাম বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে বয়নব্যয়। এ কারণে ভারতীয় শাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না এ শাড়ি। এর সঙ্গে আছে রং আর নকশাবৈচিত্র্যে স্পষ্ট দুর্বলতা।

মিরপুর বেনারসিপল্লিতে বেনারসি বয়ন করছেন একজন কারিগর। ছবি: সৈয়দ আশরাফুল আলমভারতে বেনারসির উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। ডিজাইনে নতুনত্ব থেকে বয়ন সময় কমিয়ে আনাসহ নানা ব্যবস্থা সেখানে আছে। আছে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও উন্নয়ন। কিন্তু এ সবকিছুরই ধার এখানে ধারা হয় না। ফলে দিনে দিনে কমছে তাঁতের সংখ্যা। সমান্তরালে কমেছে বয়নশিল্পীর সংখ্যাও। একটি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকে নানা পেশাজীবী। বেনারসিও এর বাইরে নয়। এখানে স্পষ্ট পরিচর্যা আর পৃষ্ঠপোষণার ভাটার টান দেখ যায়।

মিরপুরে ছিল আশির দশকের গোড়ায় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল অন্তত এক লাখ পরিবার। ১৯৩০-এর দশকে মূলত ভাগ্যের অন্বেষণে উত্তর প্রদেশ থেকে বেনারসি তন্তুবায় সম্প্রদায়ের এই বঙ্গে পদচারণ। সাতচল্লিশের ভারতভাগের পর সেটা আরও বৃদ্ধি পায়। তখন পুরান ঢাকাই ছিল মূলকেন্দ্র। তবে আইয়ুব খানের সময় মিরপুর ১০, ১১ ও ১২ নম্বরে তাঁদের জন্য জায়গা বরাদ্দ হলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বয়নশিল্পীরা এখানে চলে আসেন। এঁদের সঙ্গে এই শিল্পে যুক্ত হন বাঙালিরাও।

কিন্তু তাঁদের সে সুদিন নেই। বর্তমানে জীবন চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। টুকটাক যা-ও ছিল, তা গেছে করোনাকালের আকালে। পরিস্থিতি এতটাই দুঃসহ যে পুরো বয়নশিল্পী সম্প্রদায় রয়েছে বিলুপ্তির হুমকিতে। শিল্পের প্রতি মায়া যতই থাক, আমাদের তো আসলে বেঁচে থাকতে হবে। তাই পেশা বদল ছাড়া কোনো গতি আর থাকবে না, বললেন বিমর্ষ বয়নশিল্পী মোহম্মদ রফিক।

বর্ষীয়ান এই বয়নশিল্পীর উপর্যুপরি অনুরোধ, ত্রাণ সহায়তার, সুলভ মূল্যে চাল কিনতে পারার জন্য রেশনকার্ডের ব্যবস্থার।

হস্তচালিত বয়ন এলাকার পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে যন্ত্রচালিত তাঁত বসানোর নিয়ম নেই ভারতে। বরং সেটা কঠিনভাবে অনুসরণ করা হয়ে থাকে। অথচ বাংলাদেশে এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং লোকজশিল্পের ঐতিহ্য ধ্বংসে আমরা সিদ্ধহস্ত। তাই সব বয়ন এলাকায় যন্ত্রচালিত তাঁতের রমরমা। বেনারসিপল্লিতে এখনো সেটা না হলেও পরিস্থিতিই তাঁদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিপদ থেকে উদ্ধারের দায়িত্ব নিতে হবে তাঁত বোর্ডকেই। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়। ফলে কোনো ত্রাণ, কোনো ধরনের সহায়তা কোনো বয়ন এলাকাতেই পৌঁছেনি। বেনারসিপল্লির অবস্থাও তথৈবচ।





সম্পূর্ণ রিপোর্টটি প্রথম আলোতে পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: