নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান

গণতন্ত্রকে রক্ষায় বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করতে সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপিসহ দেশের কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতারা। তারা বলছেন, ‘নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে শুদ্ধ করতে আবারও নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। এরই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে।’

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে বিএনপির গবেষণা সেল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনআরসি) কর্তৃক আয়োজিত এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বিরোধী রাজনৈতিক কয়েকজননেতা।

‘রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন, করোনাভাইরাস বিপর্যয়ের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের আবারও সংবিধান বিরোধী পদক্ষেপ’ শীর্ষক শিরোনামে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না, ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান, বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ, নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব রশিদ সরকার আলোচনা করেন।

আলোচনায় জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটাতে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই বলে জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, এর কোনও বিকল্প নেই। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে, জনগণের অধিকার রক্ষায় সব রাজনৈতিক দলকে একজায়গায় আসতে হবে। নির্বাচনি প্রক্রিয়াটিকে শুদ্ধ করে আনার জন্য আবারও নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলতে হবে এবং এই সরকারকে চলে যেতে হবে। এই দাবি তুলতে হবে, এর কোনও বিকল্প নেই।’

নির্বাচন কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন আইন করার বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের এই কঠিন সময়ে আরপিও সংশোধনের উদ্দেশ্য একটাই, আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় নিয়ে আসা। এজন্যই নিরপেক্ষ সরকার পদ্ধতির তত্ত্বাবধায় সরকারব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ। এটা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে।’

এই প্রক্রিয়া এক-এগারো থেকে শুরু হয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তখন থেকে। রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে, সচেতনভাবে শুরু হয়েছে। ২০১৪, ২০১৮-এর নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করেছে এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে।’

নির্বাচন কমিশন তাদের প্রভূদের ক্ষমতায় রাখতে সব আইন তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন বিএনপির মহাসচিব। বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা আসুন, আমাদের দায়িত্ব পালন করি। জনগণের কাছে আমাদের যে কমিটমেন্ট আছে, সেই কমিটমেন্ট নিয়ে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। এই সরকারকে চলে যেতে বাধ্য করে নতুন করে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া চালু করি। জনগণের মতামতকে যদি সত্যিকার অর্থে গুরুত্ব দিতে হয়, সত্যিকার অর্থেই যদি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, তাহলে জাতীয় ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ভালো কিছু দেবে তা মনে করার কারণ নেই। আমি তাদের কাছ থেকে আশা করি না। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাক, জনগণ মতামত দেওয়ার সুযোগ পাক, সেটা নির্বাচন কমিশন চায় না। জনগণের প্রতিনিধিত্ব আসুক, তারা চায় না। তারা চায় একটি বিশেষ দল, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে দিতে।’

করোনাকালে আগামী ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত যশোর-৬ এবং বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচন অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘যেখানে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে, সেখানে নির্বাচন কমিশন সরকারের সুপারিশ না শুনে নির্বাচন আয়োজন করেছে। আমরা এটার প্রতিবাদ জানাই, নিন্দা জানাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধভাবে সব গণতান্ত্রিক-দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশনের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী পথ পরিহার করতে বাধ্য করার জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রিজার্ভ থেকে অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘প্রতিদিন ১০-২০ টি পরিবার ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। দেশ কত বড় ক্রাইসিসে পড়লে ফরেন রিজার্ভে হাত দিতে চায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে রাখতে চাইছে। জনগণকে সংগঠিত করতে হবে। এই সরকার ক্ষমতায় থেকে আবার একটা নির্বাচন দিলে আগের মতোই হবে।’

নির্বাচন কমিশন বিএনপির একটি প্রস্তাবও গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করেছেন ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘ইসিকে সরকার ইচ্ছাপূরণের জন্য কাজে লাগিয়েছে। করোনাভাইরাসের মধ্যে যখন সবাই রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ রেখেছে, তখন তারা আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটা গ্রহণ করার কোনও যুক্তসঙ্গত কারণ আমি দেখি না।’

নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন আইন সংশোধনের পেছনে বিএনপিকে বিপদাপন্ন করার উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন আইন সংশোধনের উদ্যোগ ষড়যন্ত্রমূলক, দুরভিসন্ধিমূলক। আইন পরিবর্তনের এই উদ্যোগ অসময়োচিত, অনৈতিক, অর্থহীন ও অযৌক্তিক।’ এই আইন সংশোধন না করতে বিএনপির পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে উল্লেখ করছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। আর এই উদ্যোগ যেন ইসি গ্রহণ করতে না পারে, সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নাই। তাদের সেখানে বসানো হয়েছে অব্যাহতভাবে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসাতে। করোনাকালে যখন সারা বিশ্বের মানুষ জীবন-জীবিকার জন্য লড়াই করছে, তখন নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ভিন্ন। মানুষ এখন বাঁচতে পারবে কিনা, সেই ভাবনায় চিন্তিত।’

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘এখন মানবিক ও কল্যাণকর একটি রাষ্ট্রের চিন্তা মানুষের মনে। মানুষ এখন নতুন সামাজিক চুক্তির মুখোমুখি। বিশ্ব কীভাবে বাঁচবে, জীবন কীভাবে বাঁচবে, সেই চিন্তা। এরকম অবস্থায় ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য, ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা যদি কাজ করে, তাহলে মানবিকতা কোথায়।’

সাবেক এই বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের মানবিকতা কোথায়? বাংলা ভাষার নামে যারা এই সময়ে এমন আইন আনতে পারে, তাদের মনে কী মানবিকতা কাজ করছে, তারা কী সমাজে আছে, তারা কী মানুষ?’

বিএনপি কমিউনিকেশন সেলের পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক জহির উদ্দিন স্বপনের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় নির্বাচন কমিশনের সাবেক সচিব রশিদ সরকার বক্তব্য রাখেন।

 

 

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: