রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার পথে সব ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে মিয়ানমার

রোহিঙ্গা (ছবি: ফোকাস বাংলা)মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে তিন বছর আগে দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে আট লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা এসেছে ২০১৭ সালের আগস্টের পরে। গত তিন বছরে মিয়ানমারের চরম অনাগ্রহের কারণে ওই রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে পারেনি। যদিও রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়ভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে এবং ২০১৯ এর আগস্টে- দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে মিয়ানমার ব্যর্থ হওয়ার কারণে রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানায়। বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মিয়ানমার এবিষয়ে আরও অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কবে শুরু হবে এবং এই রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ কী সে বিষয়ে সবার সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, রাখাইনে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য মিয়ানমার কিছুই করছে না। শুধু তাই না, তারা ফেরত যাওয়ার জন্য সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে, রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের দায়বদ্ধতার জন্য আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত শুনানির পরে একটি অন্তবর্তীকালিন আদেশ জারি করেছে। আবার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবীরা আদালতের অনুমতি পাওয়ার পরে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছেন। দুটি আন্তর্জাতিক আদালতেই বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান আছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে অপরাধ সংঘঠিত হয়েছে সেটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও অনেক গুরুতর। এ কারণে আন্তর্জাতিকভাবে এ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।রোহিঙ্গা (ছবি: ফোকাস বাংলা)

রোহিঙ্গাদের তালিকা

প্রত্যাবাসনের জন্য যাচাই-বাছাই করতে সরকার পাঁচ দফায় আট লাখ ৫৩ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমার সরকারকে দিয়েছিল। প্রথম দফায় আট হাজার ৩২ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৮৪ জনের। দ্বিতীয় দফার ২২ হাজার ৪৩২ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই হয়েছে মাত্র চার হাজার ৬৫০ জনের। অর্থাৎ সাড়ে আট লাখের মধ্যে ১০ হাজারেরও যাচাই বাছাই শেষ করেনি মিয়ানমার।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটি

এ সংক্রান্ত কমিটির চতুর্থ বৈঠক গত বছরের মে মাসে হয়েছে। এরপর বাংলাদেশ আবার ভৈঠকের জন্য ফেব্রুয়ারিতে তারিখ ঠিক করার আগ্রহ প্রকাশ করলেও মিয়ানমার এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও কিছু জানায়নি। এদিকে ২০১৮ এর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় কমিটিও কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারছে না।

বর্তমানে রোহিঙ্গাদের অবস্থা

কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ ২০১৭ এর আগস্টের পরে এসেছে। এর আগে ২০১৬ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অপারেশন শুরু করলে ও ২০১২ সালে রাখাইনে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হলে অনেক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে। এর আগে ১৯৯২ সালে যে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসেছিল তাদের মধ্যেও ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা এখনও বাংলাদেশে অবস্থান করছে।

বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সংস্থার সাহায্যে এই রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিচ্ছে। এ বছর জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে ৮৮ কোটি ডলার সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা ইতোমধ্যে বেশ কিছু অর্থ দিয়েছে।রোহিঙ্গা ক্যাম্প (ছবি: আবদুল আজিজ)

কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে যেসব ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা রয়েছে সেটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আগের যে কোনও সময়ের থেকে উন্নত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সাড়ে তিন হাজারের বেশি টেস্ট করা হয়েছে এবং এর মধ্যে প্রায় ৯০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে মারা যান ছয় জন। ১০ জুলাই এর পরে কেউ মারা যাননি।

ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য ফেন্সিং করা হচ্ছে যাতে করে অবৈধ কেউ অনুপ্রবেশ করতে না পারে। নিরাপত্তার কারণে এর আগে মোবাইল নেটওয়ার্ক টুজিতে নামিয়ে আনা হলেও সম্প্রতি ফোরজি নেটওয়ার্ক আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন ঝুঁকি

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের জন্য বিভিন্নমুখি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব জানান, টেকনাফ ও উখিয়ায় বাংলাদেশির সংখ্যা পাঁচ লাখ ৭০ হাজার। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১১ লাখের মতো। এই রোহিঙ্গাদের জন্য প্রায় সাত একর বনভূমি নষ্ট হয়েছে এবং এর ফলে সেখানকার জীববৈচিত্র্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূমিধ্বসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজারে জমি কমে যাওয়ায় কৃষিকাজ ব্যহত হচ্ছে এবং প্রতিদিন বাড়তি পানি ও অন্যান্য পণ্যের চাহিদার কারণে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে তিনি জানান। এর মধ্যে অন্যতম বড় ঝুঁকি হচ্ছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কারণ রোহিঙ্গারা মানবপাচার, মাদক চোরাচালান, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, যৌন ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে যা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের সমস্যা বলে তিনি জানান।

সরকারের চিন্তাভাবনা

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে যাতে করে তারা দ্রুত রাখাইনে ফেরত যেতে পারে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মূলত চারটি উদ্যোগ আমাদের তরফ থেকে আছে এবং সেগুলো আমরা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

প্রথমত, আমরা বিষয়টি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছি এবং মিয়ানমারের সঙ্গে পুনরায় বৈঠকের সময় চেয়েছি। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তিগুলি যেমন আসিয়ান, ভারত, চীন, কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ করছি যাতে করে তারা এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসে।

বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় যেমন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, মানবাধিকার কাউন্সিলসহ অন্যান্য যেসব মেকানিজম আছে সব জায়গায় বাংলাদেশ বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রয়াস চালাচ্ছে বলে তিনি জানান।

এছাড়া মিডিয়া, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, একাডেমিয়া, মানবাধিকার সংস্থা, সুশীল সমাজসহ সবার সঙ্গে সরকার যোগাযোগ রাখছে যাতে করে তারা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আরও বেশি সোচ্চার হয়।

আরও পড়ুন- 

রাখাইনে সেফ জোন প্রতিষ্ঠা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে উৎসাহিত করবে

রোহিঙ্গা সংকট: কূটনৈতিক ও করোনা জটিলতায় শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: