নিরাপত্তাহীনতায় স্থানীয়রা, রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব বাড়ছে

উখিয়ার বালুখালী এলাকায় রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী বসতি। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা সমস্যা নতুন কিছু সমস্যা নয়, তবে এই সমস্যা এখন স্থানীয়দের জন্য বহুমাত্রিক হুমকিতে পরিণতি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন করে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে স্থানীয়দের সমস্যা বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ব্র্যাকের এক গবেষণায় স্থানীয় পাঁচ শতাংশ মানুষ বলেছিলেন- রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া ঠিক হয়নি, বাতি ৯৫ শতাংশই মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালের এপ্রিলের জরিপে দেখা যায়, যারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পক্ষে ছিলেন তারাই বিপক্ষে চলে গেছেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন ৮০ শতাংশ মানুষ। এই জরিপের ফলাফলেই বোঝা যায় যে, স্থানীয়রা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রোহিঙ্গাদের কারণে। জীবন-জীবিকা নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন স্থানীয়রা।।
কয়েক দফায় এখন পর্যন্ত কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এসব রোহিঙ্গার কারণে বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফের পাঁচ থেকে ছয় লাখ মানুষ বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে জানা গেছে।

গত বছরে ইউএনডিপির এক গবেষণায় দেখা যায়, কক্সবাজারের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছেন তারা রোহিঙ্গাদের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া টেকনাফের শতভাগ এবং উখিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।

সীমান্তে বসবাসকারীরা জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত এই শরণার্থীদের সাদরে গ্রহণ করে, খাবার আর আশ্রয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল কক্সবাজারের মানুষ। কিন্তু তিন বছরে কোনও রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোয় ব্যর্থ হওয়ায় শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সব বয়সী মানুষের মধ্যেই উদ্বেগ এবং রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্টের পর থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গার আগমনে হঠাৎ করেই এই এলাকার জনসংখ্যা বেড়ে গেছে অনেক। উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন দ্বিগুণ।

স্থানীয় কৃষক ও জেলেরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের অনেকের অপরাধ প্রবণতায় স্থানীয়রা বিরক্ত হয়ে উঠেছে। তাদের কারণে কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও শ্রম বাজার এক প্রকার বন্ধ। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে কিছু লোক ছাড়া বেশিরভাগ স্থানীয় বাসিন্দাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রোহিঙ্গা ঢল শুরু হওয়ার আগে টেকনাফের ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজ, লবণ চাষ কিংবা মাছ ধরার কাজে জড়িত ছিলেন। কিন্তু এখন সেসব কাজ নেই বললেই চলে।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মতে, বিশেষ করে গত বছরের ২২ আগস্ট টেকনাফের জাদিমুরা রোহিঙ্গা ক্রন্দ্রের সন্ত্রাসী রোহিঙ্গারা ওই এলাকার যুবলীগ নেতা ওমর ফারুককে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে সেসময় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ভাঙচুর চালায় স্থানীয় বাসিন্দারা। এরপর থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব প্রকাশ পায় স্থানীয়দের মধ্যে। এর মধ্যে আবার এই বছরের মে মাসে টেকনাফে মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে অপহৃত আক্তার উল্লাহ এবং শাহ মোহাম্মদ শাহেদকে গুলি করে হত্যা করে রোহিঙ্গা ডাকাতরা।

জাদিমুরায় যেখানে এখন শালবন রোহিঙ্গা শিবির গড়ে উঠেছে, তিন বছর আগে সেখানে চাষবাদ করে সংসার চালাতেন টেকনাফের হ্নীলা নয়াপাড়া বাসিন্দা আবুল হাসিম। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের ১২ জন সদস্য রয়েছে। এখন তাদের নিয়ে খুব কষ্টের জীবনযাপন করছি। তাছাড়া সরকার ও এনজিওর কাছ থেকে কোনও সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি না। ওই জমিতে আগে সবজি চাষ করতাম, এখন তা বন্ধ। তাছাড়া আমাদের ছেলেদের অন্য কাজ পাওয়াও কঠিন। কারণ রোহিঙ্গাদের ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দিয়েই কাজ করানো যায়। তাই তাদেরই সবাই কাজে লাগায়।’

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আগে নাফ নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরতাম। কিন্তু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচার ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করেছে। তাই এখন মাছ ধরা বন্ধ। এখন বেকার দিন কাটছে, সংসারে চলছে দুর্দিন।’

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিয়মতি যাতায়াত রয়েছে স্থানীয় সাংবাদিক নুরুল হকের। কাজের সূত্রে স্থানীয়দের সঙ্গে বেশ যোগাযোগ হয় তার। তিনি বলেন, ‘আগে মানুষ যে মানবিক দিক দেখাতো, তা পরিবর্তন হয়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের কালচার, চলাফেরা- এসব নিয়ে অনেকে আপত্তি করছেন। স্থানীয় মানুষের অর্থ উপার্জন কমে গেছে। রোহিঙ্গাদের কারণে নিরাপদে চলাফেরাও কঠিন হয়েছে।’

এই সাংবাদিক বলেন, ‘স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, রোহিঙ্গারা তাদের চেয়ে সুখে আছে। এই আরাম ছেড়ে তারা আবার মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে যেতে চাইবে না।’

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য মো. আলী বলেন, ‘রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের আশপাশের এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। রাতে তারা নিজেরা পাহারার ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া রোহিঙ্গার আসার পর থেকে এলাকায় ৬০ ভাগ মানুষ এখন বেকারত্বের শিকার হয়েছে।’

টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র আবদুল্লাহ মনির বলেছেন, ‘সীমান্তে চরম হুমকিতে আছে লোকজন। কেননা রোহিঙ্গা ডাকাতের হাতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি খুন হওয়ার নজিরও রয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী আশ্রিতরা কোনও কাজে নিয়োজিত হতে পারবে না, কিন্তু তারা অল্প পারিশ্রমিকের বিনিময়ে লবণ মাঠ, চিংড়ি হ্যাচারি, চাষাবাদের কাজসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়েছে। এতে স্থানীয় দরিদ্র শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে।’

 

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: