সাংসদ শহিদের বিরুদ্ধে দেশে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ

শহিদ ইসলামকুয়েতে মানব ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগে আটক সাংসদ মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম (পাপুল) ফৌজদারি অপরাধে সে দেশে দণ্ডিত হলে সংসদ সদস্য পদ হারাতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ সরকার চাইলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো গুরুতর এই অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে দেশেই ব্যবস্থা নিতে পারে।

যদিও এক মাসের বেশি সময় ধরে আটক লক্ষ্মীপুর-২ আসনের ওই সাংসদের ব্যাপারে বাংলাদেশকে কোনো তথ্য দেয়নি কুয়েত। গতকাল বৃহস্পতিবার কুয়েতের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ শুনানি ১৯ জুলাই শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন।

গত ৬ জুন কুয়েতে সিআইডির হাতে আটক
শহিদ ইসলাম জাতীয় সংসদকে না জানিয়েই সে দেশে গিয়েছিলেন। আর তিনি ভ্রমণ করেছিলেন সাধারণ পাসপোর্টে। সাধারণত সংসদ অধিবেশনের সময় কোনো সাংসদ গ্রেপ্তার হলে সংসদকে তা অবহিত করে থাকেন স্পিকার। আর অধিবেশন না থাকলে চিঠি দিয়ে সাংসদের তা জানানোর কথা। প্রসঙ্গত, গত সংসদ নির্বাচনে শহিদ ইসলাম কৌশলে সরকারি দলের সমর্থন ও সহযোগিতা নিয়ে স্বতন্ত্র সাংসদ নির্বাচিত হন। এরপর তাঁর স্ত্রীকে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ করা হয়।

এ নিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা গণমাধ্যমের খবরে বিষয়টি জেনেছি। আর গণমাধ্যমের খবর দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে তা সংসদ সদস্যদের অবহিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৭২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সংসদ সদস্য ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে কিংবা কোনো আদালত কর্তৃক কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে বা কোনো নির্বাহী আদেশক্রমে আটক হলে গ্রেপ্তারকারী বা দণ্ডদানকারী বা আটককারী কর্তৃপক্ষ বা জজ বা ম্যাজিস্ট্রেট বা নির্বাহী কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে স্পিকারকে জানাবেন।’

এরপর ১৭৬ বিধি অনুযায়ী, স্পিকার যত দ্রুত সম্ভব সংসদ অধিবেশন থাকলে সংসদে তা পাঠ করবেন, কিংবা সংসদ অধিবেশন না চললে সদস্যদের অবগতির জন্য তা প্রচার করার নির্দেশ দেবেন।

আর সংবিধান অনুযায়ী কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা; নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ন্যূনতম দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়াসহ কিছু কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধান অনুযায়ী কি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, নাকি কুয়েতের আদালতের রায়ের জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষায় থাকতে হবে।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, আটক সাংসদের বিষয়ে কুয়েতের আদালতে বিচার শেষ হয়নি। তাই কুয়েতের আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ফৌজদারি অপরাধে কুয়েতে শহিদ ইসলামের দুই বছরের বেশি সাজা হলে সংসদে তাঁর সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। কারণ, সংবিধানে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, আইনে যা–ই থাকুক না কেন, অভিযোগটি খুবই স্পর্শকাতর ও অনৈতিক, যার সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত। সরকারের উচিত তাঁর বিরুদ্ধে মুদ্রা পাচার ও মানব পাচারের মতো অভিযোগগুলো দ্রুত খতিয়ে দেখা এবং বিচারের আওতায় নিয়ে আসা।

বিদেশিদের থাকার প্রক্রিয়া

কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মানব ও অবৈধ মুদ্রা পাচারের অভিযোগে আটক বাংলাদেশের সাংসদ শহিদ ইসলাম কুয়েতের নাগরিকত্ব পাননি। কুয়েতের এলিয়েন্স রেসিডেন্ট ল বা বিদেশিদের আবাসন আইনের আওতায় তেলসমৃদ্ধ দেশটিতে অবস্থান করছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইটে বিবৃতি দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।

বিনিয়োগের পরিমাণ এবং ব্যক্তির দীর্ঘদিনের সুনামের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিদেশি নাগরিকদের কুয়েতে থাকতে দেওয়া হয়। সেখানে ঘরবাড়ি করার অনুমতি দেয় দেশটি। তিন পুরুষ থাকার পরও কুয়েতের নাগরিকত্ব পাননি দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশের এমন একাধিক ব্যবসায়ী সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।

আতাউল গণি মামুন ৩৭ বছর আগে চাকরি নিয়ে কুয়েতে গিয়েছিলেন। ১৯৯৪ সাল থেকে প্রিন্টিং ব্যবসায় জড়িত। তিনি জানান, সাধারণত কুয়েতে কেউ বিনিয়োগ করতে চাইলে তাকে কুয়েতের একজন নাগরিককে অংশীদার হিসেবে নিতে হয়। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কুয়েতি নাগরিকের ৫১ শতাংশ এবং বাংলাদেশি নাগরিকের ৪৯ শতাংশ মালিকানা থাকবে। প্রথমবার দুই বছরের জন্য তাঁর রেসিডেন্ট ভিসা হয়েছিল। আর তাঁর ভিসার স্পনসর হয়েছিলেন কুয়েতি অংশীদার। এরপর থেকে প্রতিবার এক থেকে তিন বছর মেয়াদে তাঁর রেসিডেন্ট ভিসা নবায়ন করা হচ্ছে।

কুয়েতের এলিয়েন্স রেসিডেন্ট ল সম্পর্কে জানতে এই প্রতিবেদক তিন দশক ধরে দেশটিতে ব্যবসা ও চাকরি করছেন, এমন চার বাংলাদেশি ও দুই ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা প্রথম আলোকে জানান, কুয়েতে বিদেশিদের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে রেসিডেন্ট পারমিট (বসবাসের অনুমতি) দেওয়া হয়। সাধারণত এর মেয়াদ থাকে তিন বছর। পরে তা প্রয়োজন অনুযায়ী নবায়ন করা হয়। তবে ওই পারমিট নবায়নের সময় নির্দিষ্ট ওই নাগরিকের পাসপোর্টের মেয়াদ থাকতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যবসায়ী হলে তার ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ থাকতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা পাসপোর্ট অ্যান্ড ইমিগ্রেশন দপ্তর ওই পারমিট দিয়ে থাকে। তাই যে পেশারই হোন না কেন, কুয়েতে আসা বিদেশি সব পেশাজীবী রেসিডেন্ট পারমিট নিতে পারেন, নাগরিকত্ব নয়।

কাজেই শহিদ ইসলাম ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিবার তাঁর কুয়েতি অংশীদারকে স্পনসরের সই নিয়ে রেসিডেন্ট ভিসা নবায়ন করে আসছেন।





সম্পূর্ণ রিপোর্টটি প্রথম আলোতে পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: