দুই শতাধিক বিজ্ঞানীর চ্যালেঞ্জের মুখে ডব্লিউএইচও-এর গাইডলাইনে পরিবর্তন?

দুই শতাধিক বিজ্ঞানীর করা চ্যালেঞ্জের মুখে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রকাশিত ওই নির্দেশনায় সংস্থার পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়, কোভিড-১৯ এর কিছু বায়ুবাহিত সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এখনই করোনাভাইরাসকে চূড়ান্ত অর্থে বায়ুবাহিত রোগ বলে ঘোষণা দিতে রাজি নয় তারা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে জরুরি ভিত্তিতে আরও গবেষণা করতে হবে। এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারলে স্বাস্থ্যবিধির গাইডলাইনেও পরিবর্তন আনবে তারা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

শুরুর দিকে ধারণা করা হতো যে হাঁচি বা কাশির ফলে ছড়ানো ড্রপলেটের মাধ্যমেই করোনাভাইরাস ছড়ানো সম্ভব। সে কারণেই মহামারির শুরুর দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষার জন্য হাত ধোয়াকে অন্যতম একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। সম্প্রতি ৩২টি দেশের ২৩৯ জন বিজ্ঞানী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে একটি উন্মুক্ত চিঠি লেখেন। সেখানে বায়ুবাহিত সংক্রমণের বিষয়টিকে মাথায় রেখে করোনাভাইরাস গাইডলাইন হালনাগাদ করার আহ্বান জানান তারা। ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করা রসায়নবিদ এবং কোলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোসে জিমেনেজ বলেন, “এমন না যে এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিরুদ্ধে আক্রমণ। এটি একটি বৈজ্ঞানিক বিতর্ক। আমরা এটি জনসম্মুখে নিয়ে এসেছি, কারণ আমাদের মনে হয়েছে বেশ কয়েকবার বলার পরও তারা আমাদের কথা শুনছে না।”

৭ জুলাই (মঙ্গলবার) জেনেভায় প্রেস ব্রিফিংয়ে ডব্লিউএইচও’র সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক টেকনিক্যাল প্রধান বেনেডেত্তা অ্যালাগ্রাঞ্জি বলেন, করোনাভাইরাসের বায়ুবাহিত সংক্রমণের প্রমাণ হাজির হচ্ছে তবে এখনও তা চূড়ান্ত নয়। তিনি বলেন, জনসমাগম স্থলে নির্দিষ্ট পরিবেশে, অতিরিক্ত মানুষ, বদ্ধ, আলো-বাতাস প্রবেশের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকার মতো পরিবেশে বায়ুবাহিত সংক্রমণের বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও এখন প্রমাণ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ডব্লিউএইচও প্রকাশিত নতুন সংক্রমণ নির্দেশনায় বলা হয়, রেস্তোরাঁ, ফিটনেস ক্লাসের মতো কিছু কিছু আবদ্ধ জনাকীর্ণ জায়গায় করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা দেখা গেছে। এগুলো অ্যারোসল ট্রান্সমিশন বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘এ ধরনের ঘটনাগুলো দ্রুত তদন্ত করার পাশাপাশি তা কোভিড-১৯ ছড়ানোর ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখছে তাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।’

আর এই ধরণের সংক্রমণের প্রমাণ সম্পর্কে যদি নিশ্চিত হওয়া যায়, তাহলে বদ্ধ জায়গায় কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, সেই সংক্রান্ত গাইডলাইনে পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন নির্দেশনা মোতাবেক মানুষের উচিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি ভিড় এড়িয়ে চলা এবং ভবনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা।

এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুধু স্বীকার করেছিল, সুনির্দিষ্ট মেডিক্যাল প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে করোনা ভাইরাস। ভার্জিনিয়া টেক-এর অ্যারোসল বিশেষজ্ঞ লিনসে মার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ওই প্রতিবেদনটি দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। তবে খোদ লিনসে মারও এখন মনে করেন, বাতাসের মাধ্যমে করোনা ছড়ানো সম্ভব।

লিনসে মনে করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যারোসল ও ড্রপলেটের পুরনো একটি ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করছে। তারা ড্রপলেটের আকার এবং কতটুকু তারা যেতে পারে তার উপর বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।  সংস্থাটির দাবি, অ্যারোসল হলো যেসব কণার আকার ৫ মাইক্রনের নিচে।  একমাত্র ছোট কণাগুলোই বাতাসে অনেক্ষণ ভেসে থেকে এবং শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে বলে মনে করে তারা। তবে লিনসে মনে করেন, এর চেয়ে বড় কণাও সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া-বাহিত যেসব কণা বাতাসে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ভেসে থাকতে পারে, তেমন কণা নিশ্বাসের সাথে গ্রহণ করার মাধ্যমে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বায়ুবাহিত সংক্রমণ হয়ে থাকে। অতি ক্ষুদ্র এসব ড্রপলেট বড় পরিসরের জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকতে পারে।বায়ুবাহিত রোগের উদাহরণ হলো যক্ষ্মা, ফ্লু এবং নিউমোনিয়া।

তবে লিনসেসহ অন্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আকার নয়, বরং কিভাবে সংক্রমণ ছড়ালো তার ভিত্তিতে ড্রপলেট ও অ্যারোসলের মধ্যে পার্থক্য করা উচিত। কোনও ভাইরাস যদি শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করে, তবে তা অ্যারোসল। আর তা যদি আক্রান্তের সংস্পর্শে আসার কারণে ছড়ায় তবে তা ড্রপলেট।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউচি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সার্স কভ-২ বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানোর প্রচুর প্রমাণ এখনও নেই। তবে আমি মনে করি, বাতাসের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ানোর ধারণা করাটা যৌক্তিক।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের সবশেষ গাইডলাইনে এখনও পরিবর্তন না আনলেও নতুন পাওয়া তথ্য-উপাত্তগুলো যাচাই করে দেখছে তারা। নুতন পাওয়া প্রমাণের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলে গাইডলাইনে পরিবর্তন আসতে পারে, যেখানে মাস্কের আরো ব্যাপক ব্যবহার, দূরত্ব মানার ক্ষেত্রে আরো কঠোরতা অবলম্বনের – বিশেষ করে রেস্টুরেন্ট, পানশালা এবং গণপরিবহনের মতো বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হতে পারে।

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: