আগামীর পৃথিবীটা চালাবে কে?

মাসুদা ভাট্টিআমাদের পরিচিত পৃথিবীকে ওলট-পালট করে দিয়ে এখনও করোনাভাইরাস সদর্পে দেশে দেশে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে চলেছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন পঞ্চাশ হাজারের ওপরে। প্রতিবেশী ভারতেও শিগগিরই এই সংখ্যা অর্ধলক্ষ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আর বাংলাদেশেও সংখ্যাটি বাড়তিরই দিকে, কমার কথা যদিও জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আশাবাদ হিসেবে শোনানো হয়েছে, তবু ভীতিটা থেকেই যাচ্ছে। এই ভীতির কারণ আর কিছুই নয়, পৃথিবী যেকোনোভাবেই একটি অতিমারিকে সামলানোর জন্য প্রস্তুত ছিল না, এবং দেশে দেশে যে সরকারগুলো জনগণকে সেবা দেওয়ার নামে অদক্ষতার একেকটি মূর্তিমান প্রতীক তা ২০২০ সালের প্রথম ৬ মাসের মতো করে পৃথিবী আর কখনোই উপলব্ধি করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, এই ভাইরাস আরও প্রমাণ করেছে যে পৃথিবীতে আসলে ঐক্য, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব ইত্যাদি ইতিবাচক শব্দগুলোর কোনোই কার্যকর অর্থ নেই, উল্টো এই করোনাকালে আমরা দেখতে পেলাম দেশে দেশে যুদ্ধ, একে অন্যের ব্যবসায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা এবং সর্বোপরি ধনী দেশগুলোর এই সুযোগে গরিব দেশগুলোকে আরও চাপে রাখার নগ্ন চেষ্টা। এসব দেখে-শুনে এই প্রশ্ন তোলাটা এখন জরুরি হয়ে পড়ে যে পৃথিবীটা আসলে চালাচ্ছে কে বা কারা? কিংবা তারচেয়েও বড় প্রশ্ন, আগামী পৃথিবীটাই বা কে বা কারা চালাবে?
আগেই স্বীকার করে নিচ্ছি যে শিরোনামটির ধারণা ধার করেছি দ্য ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের একটি লেখা থেকে, যার শিরোনাম “হু রানস দ্য ওয়ার্ল্ড?”
এই নিবন্ধটি মূলত এতদিনকার আমেরিকান-কব্জা থেকে পৃথিবী যে ক্রমশ চীনের আয়ত্তে চলে যাচ্ছে সেজন্য শঙ্কার কথা বলছে এবং মাঝারি শক্তি হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভেতর অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে তাদের নেতা কে হবেন সেটা নিয়ে। কারণ, চীনকে তারা নেতা হিসেবে মেনে নেবে না, আর এরই সঙ্গে ছোট ছোট ও অনুন্নত দেশগুলো নিজেদের ঘর সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে খেতে অন্যকিছুই ভাবার সময় পাচ্ছে না। এমন অবস্থায় পৃথিবীর ক্ষমতাকেন্দ্রে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে তাতে অনেক ধরনের নেতিবাচক ঘটনা ঘটতে পারে, যার মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে আর তা হলো এই করোনার মতো অতিমারিকালেও দেশগুলো একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসতে না পারার ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করা যায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, যেমন- ন্যাটো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া এবং চীনের আরও আগ্রাসী হয়ে উঠে জাতিসংঘের মতো সুপার-সরকারের একেকটি প্রতিষ্ঠান, যেমন খাদ্য ও কৃষির জন্য যে সংস্থাটি কাজ করে যা এফএও বা ফাও হিসেবে পরিচিত তার প্রধান হিসেবে একজন চীনা বংশোদ্ভূত ব্যক্তির নিয়োগলাভ (এরকম আরও প্রায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চীনা বংশোদ্ভূতদের প্রধান হওয়া)– সব মিলিয়ে এই নিবন্ধে পৃথিবীময় ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা লক্ষ করছে এবং এর ফলে পৃথিবীতে নেতিবাচক কী ঘটতে পারে তা সামান্য করে বলে, মাঝারি শক্তির দেশগুলোর ভূমিকা ও শক্তিহীন দেশগুলোর ভূমিকা কী হতে পারে সেসব সম্পর্কে ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমেরিকার এই যে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়াটা, সেটা কেন হলো, তার উত্তর এই নিবন্ধে পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে চীনের এই উত্থান নিয়ে পত্রিকাটির চিন্তার কারণ সম্পর্কে আমরা ধারণা করতে পারলেও এটা ঠেকানোর জন্য পশ্চিমা শক্তিবলয়ে ঐক্য সৃষ্টির কথাটিও কিন্তু পত্রিকাটি কোনোরকম রাখঢাক না রেখেই বলছে।
জাতিসংঘের মতো সুপার-সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধের মতো মানবসৃষ্ট হত্যাকাণ্ড ঘটার ভয়াবহতার পর। ভাবা গিয়েছিল যে এই প্রতিষ্ঠানটি অন্তত বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করবে। কিন্তু ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সংস্থাটি এখনও পর্যন্ত এমন কোনও সফলতার নজির রাখতে পারেনি, যার দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায় যে জাতিসংঘ কোনও একটি যুদ্ধ বা আক্রমণকে থামাতে পেরেছে কিংবা আক্রান্ত দেশগুলোকে রক্ষা করতে পেরেছে। পৃথিবীতে প্রতি ৯ জন মানুষের মধ্যে একজন রাতে না খেয়ে ঘুমাতে যায় এখনও, প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ এই মুহূর্তে রয়েছে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মধ্যে আর প্রায় ৮২১ মিলিয়ন মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আসলে কিছুই নেই, তারা যে জীবনযাপন করে তাকে ঠিক ‘মানুষের’ জীবন হিসেবে ধরা যায় না বলে পশ্চিমে তৈরি রিপোর্টই সাক্ষ্য দেয়– জাতিসংঘের মতো সুপার-সরকার এত বছর পরও পৃথিবীকে এই কঠিন সত্য থেকে মুক্ত করতে পারেনি। এর মূল কারণ আর কিছুই নয়, পৃথিবীর মোড়ল-জাতীয় দেশ বা সরকারগুলো আসলে জাতিসংঘকে আমলে নেয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি যে নিরাপত্তা পরিষদ বলি আর অন্য যেকোনও জাতিসংঘভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বলি, এগুলোকে ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। নিজেদের অনৈতিক ও স্বার্থপর সিদ্ধান্তকে জাতিসংঘকে দিয়ে বৈধ করিয়ে নিয়েছে। কিন্তু গত এক দশক বা তার একটু কম সময় ধরে যখন বৈশ্বিক ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোতে একটু নড়চড় শুরু হয়েছে, বদলাতে শুরু করেছে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র তখন জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানকে একটু হলেও এড়াতে শুরু করেছে আমেরিকার মতো দেশ। কারণ, এটা অনুমান করা যাচ্ছে যে আগের মতো জাতিসংঘকে দিয়ে খুব সহজেই ইরাক আক্রমণ কিংবা অন্য যেকোনও দেশকে আক্রমণ করার ইচ্ছেকে ঠিক বৈধ করানো যাচ্ছে না কিংবা গেলেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। ফলে আমেরিকা জাতিসংঘ কিংবা এরকম প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে পরিমাণ অর্থসাহায্য এতদিন দিয়ে এসেছে তার পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই সত্য আরও উন্মোচিত হতে শুরু করেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দিয়ে নিজেদের পকেটে পুরে রাখা যাবে না তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রাখার প্রয়োজন কি তবে? এরমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেমন রয়েছে তেমনই রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণবাদী সংস্থা কিংবা কার্বন উৎপাদন কমানোর লক্ষ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলো। এদের অনেকের সঙ্গেই আমেরিকা বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে এবং কিছু কিছু বিচ্ছেদ ঘটানোর প্রক্রিয়া চলছে। মজার ব্যাপার হলো, ন্যাটোর মতো সামরিক সংস্থাকেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্রের যতটা উপকার হওয়ার কথা ঠিক ততটা হয় বলে তিনি মনে করেন না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমরা অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মেলাতে পারি না, কিন্তু একথা ভুললে চলবে না যে, তিনি একটি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এবং তিনি ভালোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের কীসে লাভ আর কীসে ক্ষতি, সেটা বোঝেন। দ্য ইকোনমিস্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্লান্ত, আর চীন এখন সর্বগ্রাসী, কিন্তু অনেক পণ্ডিত একথা বলতে চান যে যুক্তরাষ্ট্র আসলে ক্লান্ত নয়, চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত হার, পশ্চিম থেকে ক্ষমতাবলয় পূর্বে সরে যাওয়া, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আর কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়া এবং দেশের ভেতরকার অর্থনীতির মন্দা দেশটিকে বিপাকে ফেলেছে কেবল তাই-ই নয়, বরং এই উপলব্ধিতে এনে ফেলেছে যে পৃথিবীর জন্য তাদের খরচটা আয়ের চেয়ে বেশিই হয়ে যাচ্ছে, যেটা থামানো প্রয়োজন। মার্কিন জনগণকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সত্যটি বোঝাতে পেরেছেন বলেও মনে হয়, যদি এ বছরের নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি হেরে যান তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও হতে পারে, তবে সেই ভিন্নতা আমেরিকাকে নতুন করে যুদ্ধংদেহি করে তুলতে পারে, এটাও কেউ কেউ মাথায় রাখছেন।
সুতরাং প্রশ্নটা এখন আর ‘পৃথিবী কে চালাচ্ছে?’ সেটা নয়, বরং ‘পৃথিবীটা চালাবে কে?’ সেটাই হওয়া উচিত এবং আলোচনা সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে। জাতিসংঘের মতো সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাদর্পী দেশের একটু একটু করে দূরে সরে যাওয়া শাপে বর হবে যদি যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় চীনের আধিপত্য বিস্তারকে ঠেকানো যায়। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে চীন ও রাশিয়া একজোট হয়ে থাকে বলে বদনাম রয়েছে, অথচ তাদের যারা বদনাম করে অর্থাৎ বাকি তিন জন স্থায়ী সদস্যও কিন্তু নিজেদের একজোট হয়ে থাকাটাকে কখনোই লুকিয়ে রাখে না। ভোটের ক্ষেত্রে এই জোটভিত্তিক পদক্ষেপের রকমফের খুব কমই ঘটেছে। ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর কথা শোনা যাচ্ছে, যা অবশ্যই প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে, পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্যই, এমনকি জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানকে আরও গুরুত্ববহ করে তোলার জন্যই– কিন্তু সেখানেও জোটভিত্তিক রাজনীতি কতটা কী করতে পারবে সে প্রশ্ন গুরুতর হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে করোনাকাল অতিক্রম করার পর পৃথিবীর ক্ষমতার অক্ষটি কোন দিকে কতটা হেলবে বা উত্থিত হবে তা নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়েছে সর্বত্র। এরমধ্যে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন আসছে, তার ফলাফলও আগামী পৃথিবী কে চালাবে তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এই মুহূর্তে পৃথিবীময় চলছে ক্ষমতা দখলের গোপন কিন্তু তুমুল প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় ক্ষুদ্র কিংবা মাঝারি শক্তির দেশগুলো দর্শকমাত্র, যদিও সাধারণ পরিষদে চীন বা আমেরিকার মতো শক্তিধর দেশের যেমন একটি ভোট তেমনই বাংলাদেশের মতো দেশেরও একটিই ভোট, কিন্তু সে ভোটে যে কিছুই এসে যায় না, সেও তো প্রমাণিত সত্য। সুতরাং করোনাকাল শেষে পৃথিবীতে চলমান ক্ষমতা-দ্বন্দ্ব কোনদিকে ধাবিত হয় সেটা দেখার অপেক্ষাতেই রয়েছে পৃথিবী, আপাতত মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যাই এখনও মূল আলোচ্য যদিও।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]





সম্পূর্ণ রিপোর্টটি প্রথম আলোতে পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: