ভারতের ‘ডিজিটাল স্ট্রাইক’ চীনের কী পরিমাণ ক্ষতি করতে পারলো?

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে উরিতে জঙ্গি হামলার বদলা নিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের ভেতরে ঢুকে রাতের আঁধারে যে কথিত অভিযান চালায়; তা ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এর চার বছরের মাথায় চীনের সঙ্গে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত রাতারাতি সে দেশের ৫৯টি অ্যাপ  নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে; দিল্লি সরকার তাকে বলছে ‘ডিজিটাল স্ট্রাইক’ । 

এই ‘ডিজিটাল স্ট্রাইক’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন ভারতের সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ। তার যুক্তি, ভারতে টিকটক-সহ এই সব চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় চীনের বিভিন্ন কোম্পানিকে যে পরিমাণ রাজস্ব হারাতে হবে তা কোনও সামরিক হামলার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। সেই ক্ষতির পরিমাণ আসলে কেমন? চীনের জন্য এই ‘আঘাত’ কি সত্যিই বিচলিত হওয়ার মতো?

বস্তুত চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালেয়র মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান এর মধ্যেই জানিয়েছেন ভারতের সিদ্ধান্তে তারা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’ এবং এর কী অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রভাব পড়বে, বেইজিং তা খতিয়ে দেখছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন গত ৫ জুলাই এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এরপর শুক্রবার (১০ জুলাই) ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, ‘চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রত্যাঘাতের আর্থিক মূল্য হবে চরম’। তবে এই সিদ্ধান্তের জের চীন ও ভারত উভয়ের জন্যই যে ‘যন্ত্রণাদায়ক’ হবে সেটাও তারা মনে করিয়ে দিয়েছে।

 

টিকটকের মালিকানা সংস্থার ক্ষতিই ৬০০ কোটি ডলার

মাত্র কদিন আগেও ভারতে জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ টিকটকের গ্রাহক ছিলেন বারো কোটির বেশি।  এ বছরেরও প্রথম তিন মাসে অ্যাপটি ভারতে ডাউনলোড হয়েছে ৬ কোটিরও বেশি বার। ভারতের সেই বিপুল বাজার রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টিকটকের মালিক সংস্থা বাইটড্যান্স লিমিটিডের অন্তত ৬শ’ কোটি ডলার লোকসান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় মুখপত্র দ্য গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, চীনের কেয়াক্সিংগ্লোবাল ডটকম-কে এই তথ্য দিয়েছেন বাইটড্যান্সেরই এক সিনিয়র কর্মকর্তা ।

টিকটক ছাড়াও এই একই সংস্থার ভিগো ভিডিও এবং হেলো অ্যাপও ভারতে ভীষণ জনপ্রিয় ছিল, এই তিনটি অ্যাপ মিলে ভারতে প্রতি মাসে কুড়ি কোটি অ্যাকটিভ ইউজারও ছিলেন। এক ধাক্কায় এখন তার সবটাই হারাতে হল বাইটড্যান্সকে।

কোপ পড়ছে আলিবাবা, বাইডু, টেনসেন্টেও

শুধু বাইটড্যান্সই নয়, চীনে আলিবাবা, বাইডু বা টেনসেন্টের মতো অন্যান্য টেক জায়ান্টের জন্যও বিশাল বাজার একশ’ তিরিশ কোটি মানুষের দেশ ভারত। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভিডিও গেমিং কোম্পানি টেনসেন্ট, তাদের মেসেজ শেয়ারিং অ্যাপ উইচ্যাট ভারতেও ইদানিং খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। গত ২৯ জুনের সরকারি সিদ্ধান্তে সেই উইচ্যাট-সহ টেনসেন্টের আরও পাঁচটি অ্যাপকে নিষিদ্ধ করেছে ভারত।

জ্যাক মা’র আলিবাবা গ্রুপ কিংবা বাইডু ইনক-এর যে সব ডিজিটাল প্রোডাক্ট ভারতে জনপ্রিয় হয়েছিল, সেগুলোও কলমের এক খোঁচায় মোবাইল থেকে আনইনস্টল করতে বাধ্য হয়েছেন ভারতীয়রা। এর জন্য এই সব টেক জায়ান্টদেরও বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে কোনও সন্দেহ নেই, তবে এই সংস্থাগুলি সেই ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে এখনও মুখ খোলেনি।

ভারতের দেখানো রাস্তা কি অন্য দেশও নেবে?

কেবল ভারত নয়, চীনের জন্য বড় দুশ্চিন্তার বিষয়  বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও। বিশেষত যাদের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়; তারাও ভারতের দেখানো পথে হাঁটলে চীনের এই প্রযুক্তি রফতানির বাণিজ্য বড় ধরনের হোঁচট খাবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এর মধ্যেই ঘোষণা করেছেন, আমেরিকাও চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করার কথা ভাবতে পারে। এই বার্তা চীনের জন্য অশনি সংকেত বয়ে এনেছে।

অস্ট্রেলিয়া থেকে ব্রিটেন, জার্মানি থেকে ভিয়েতনাম – বিশ্বের নানা প্রান্তেই নানা দেশের সঙ্গে চীনের এখন সম্পর্ককে মধুর বলা চলে না। চীনা মোবাইল ও টেলিকম কোম্পানি হুয়াইয়ে-র নিরাপত্তা রেকর্ড নিয়ে বিশ্বের বহু দেশই সন্দিগ্ধ। কানাডা তো তাদের এক কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ধরে আটকেই রেখেছে, প্রধানমন্ত্রী জাস্তিন ত্রুদো তাকে ছাড়তেব রাজি হচ্ছেন না। চীনা অ্যাপগুলি ডেটা গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে, এই ধরনের সন্দেহের বাতাবরণে আরও অনেক দেশ সেগুলো নিষিদ্ধ করলে চীনের জন্য তা বিরাট সঙ্কটের চেহারা নেবে।

ভারতে অ্যাপ ব্যানের প্রভাব কী?

বিভিন্ন চীনা সংস্থার হয়ে ভারতেও কর্মরত ছিলেন বহু নাগরিক, অ্যাপ নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে তারা সরাসরি কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। কেবল টিকটকের হয়ে ভারতে কাজ করতেন দুহাজারেরও বেশি কর্মী, তারা এখন কর্মহীন হওয়ার মুখে। টিকটক প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে ভারতে যে শত শত ‘তারকা’র জন্ম হয়েছিল এবং যাদের অনেকেই প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করছিলেন; তাদেরও এখন ইনস্টাগ্রামের মতো অন্য প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকতে হচ্ছে।

এদিকে অনেকেই আবার এই পরিস্থিতিকে ভারতীয় অ্যাপগুলোর জন্য বিরাট এক সুযোগ হিসেবেও দেখছে। ভারত চীনা অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ করার দুদিন পরেই সুপরিচিত ভারতীয় কূটনীতিক ও জাতিসংঘে ভারতের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি সৈয়দ আকবরউদ্দিন এক টুইটার পোস্টে জানান, মাত্র দুই দিনের ভেতর ‘রোপোসোলাভ’ এবং ‘চিঙ্গারি’ নামে দুইটি সম্পূর্ণ ভারতীয় অ্যাপ এ দেশে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলোর তালিকার শীর্ষে চলে এসেছে।

‘চিঙ্গারি’ তৈরি করেছেন ব্যাঙ্গালোরের কয়েকজন শিল্পোদ্যোগী। ভারতে এটিকে টিকটকের জায়গা নিতে রীতিমতো কোমড় বেঁধে নেমেছে তারা। এই ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বাঙালি যুবক সুমিত ঘোষ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘২৯ জুন রাতে টিকটক নিষিদ্ধ হওয়ার ঠিক পর দিনই (৩০শে জুন) ভারতে এই অ্যাপটি প্রতি ঘন্টায় প্রায় তিন থেকে পাঁচ লক্ষ বার ডাউনলোড করা হয়েছে, যা আমরা ভাবতেও পারিনি!’

চীনা অ্যাপগুলোর শূন্যস্থান পূরণ করতে ভারতে এখন দেশি অ্যাপগুলোর মধ্যে চলছে তুমুল প্রতিযোগিতা। অন্য দিকে চীনা কোম্পানিগুলিকে কষতে হচ্ছে ক্ষতির অংক। নতুন করে সাজাতে হচ্ছে তাদের গ্লোবাল বিজনেস প্ল্যান।     





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: