করোনাও থামাতে পারেনি নারী নির্যাতন

লীনা পারভীনগোটা বিশ্ব আজ থমকে আছে। ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছে কোটি মানুষ। এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশও। ডিসেম্বর মাসে প্রথম করোনার আক্রমণ ঘটে চীনে এবং একে একে ছড়িয়ে পড়ে এই মরণ ঘাতক। বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় মার্চ মাসে। তারপর থেকে হু হু করে বেড়ে চলেছে এর আঘাত। আমার আজকের এই লেখার বিষয়বস্তু করোনার কারণে বেড়ে যাওয়া নারী ও শিশু নির্যাতন।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় পুরুষের বিনোদন বা আক্রোশ মেটানোর একটি সহজ মাধ্যম হচ্ছে নারী। হাতের কাছে সহজলভ্য হলেই তারা তাদের মনের খায়েশ মেটাতে চায় অবলীলায়। আমাদের এই পশ্চাদপদ সমাজব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা। কোনও ধরনের সামাজিক বা বৈশ্বিক মহামারিও এর থেকে নারীকে পরিত্রাণ দিতে পারে না।
স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন খবরের কাগজে আমরা নারী ও শিশু নির্যাতনের সংবাদ পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে যাই। ভেবেছিলাম হয়তো করোনার মতো এমন মরণঘাতী ভাইরাসের ভয়ে হলেও নির্যাতক পুরুষেরা একটু দমন ধরবে। না, সেটি হচ্ছে না। থেমে যায়নি ধর্ষণ বা নির্যাতন। এই নির্যাতন যেন আরও নতুন রূপ পেয়েছে করোনার কারণে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এক জরিপে দেখিয়েছে করোনায় লকডাউনে থাকার কারণে এ পর্যন্ত মোট ১৩৪৯৪ জন নারী ও শিশু নানাধরনের গৃহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৬৪ জেলার মধ্যে মোট ৫৩টি জেলায় টেলিসার্ভের মাধ্যমে পাওয়া এই তথ্য আমাদের চিন্তিত করে তোলে। মোট নির্যাতিত নারী ও শিশুর মধ্যে ২৮৪৮ জন নারী ও ১৩১৯ জন শিশু প্রথমবারের মতো নির্যাতনের শিকার হয়েছে, অর্থাৎ তারা এর আগে এই ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হয়নি কখনও। এই চিত্রটি হয়তো গোটা বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সম্পূর্ণ চিত্রকেও প্রকাশ করেনি। ধরে নেওয়া হচ্ছে যে নির্যাতনের হার এর চেয়েও আরও অনেক বেশি।

এই নির্যাতনের মাঝে যুক্ত আছে ধর্ষণের মতো অপরাধও। আমরা দেখেছি এর মধ্যেই বেশ কয়েকটি নারী ও নারী শিশু ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।

এমনিতেই গৃহবন্দি থেকে আমরা প্রতিটা মানুষ এক অজানা আশঙ্কায় দিন পার করছি। আছে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যতের বিপদের আশঙ্কা। করোনার হানা কেবল জীবন নেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এই আঘাত এসেছে আমাদের সকলের জীবন ও জীবিকার মাঝেও। নিম্নবিত্ত হয়ে যাচ্ছে সর্বহারা আর মধ্যবিত্ত শামিল হয়ে পড়ছে নিম্নবিত্তের কাতারে। তবে সবচেয়ে বিপদে আছে মধ্যবিত্ত সমাজ। এমনিতেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি সম্মান বা মর্যাদাসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অভাব আছে, তার মধ্যে লকডাউনে সারাক্ষণ বাসায় থেকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় পুরুষ হয়ে উঠছে আরও ভয়ঙ্কর। হতাশা থেকে নিরসন পেতে তারা বেছে নিচ্ছে নারীকে।

করোনা শুরুর প্রথম থেকেই আমরা বিশ্বের নানাদেশ থেকে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের খবর পাচ্ছিলাম, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল জাতিসংঘ। উন্নত দেশগুলোতে অভিযোগ জানানোর জন্য নির্ধারিত ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর চর্চা একেবারেই নেই বললেই চলে। আমাদের দেশে স্বাভাবিক সময়েই নারীরা তাদের ওপর চলে আসা নির্যাতনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চায় না। আছে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নানা ধরনের সামাজিক হয়রানির আশঙ্কা। আর এখন এই করোনাকালে গোটা দেশ ব্যস্ত আছে করোনা মোকাবিলার নানা প্রস্তুতি নিয়ে, যেখানে অনুপস্থিত আছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ইস্যুটি। আমাদের স্থানীয় প্রশাসনগুলোর কাছে প্রধান দায়িত্ব এখন করোনাকে মোকাবিলায় সরকারি আদেশ ও নির্দেশ মোতাবেক কাজ করা। স্বাস্থ্য সুবিধাকে কতটা জনবান্ধব করা যায়, সেটি নিয়ে ভূমিকা রাখা। এর মধ্যেই বেড়ে চলেছে নারীর প্রতি সহিংসতা। এই বিষয়টি এক প্রকার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। একটি পরিবারে যখন দুর্যোগ নেমে আসে তখন সেটিকে মোকাবিলার জন্য পরিবারের সকল সদস্যকেই সমান ভূমিকা রাখতে হয়। সেখানে নারী বা পুরুষের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ থাকার কথা নয়। স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ে মিলেই বিপদকালীন সময়কে উতরে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে হয়। কিন্তু সংসারে মত প্রকাশ করার মতো সুযোগের অভাবে আমাদের দেশের নারীরা থেকে যায় অবহেলিত। পুরুষ মনে করে সে একাই সকল সিদ্ধান্ত নিতে পারে বা বিপদ থেকেও সে একাই উদ্ধার করতে পারবে। এক্ষেত্রে নারীটিকে সে মনে করে কেবল একজন পুতুল মাত্র। একা একা লড়াই করতে গিয়ে যখন কোনও সুরাহা হয় না তখনই আসে হতাশা, আর সেই হতাশা থেকে মুক্তি একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেয় নারীর ওপর নির্যাতনের মতো রাস্তা। একবারের জন্যও ভাবে না যে সংসারের উত্থান পতন যেমন পুরুষকে প্রভাবিত করে, ঠিক একই মাত্রায় নারীটিকেও প্রভাবিত করে। পরিবারের শিশুরাও এখন গৃহবন্দি। যে পরিবারে শিশু আছে, তাদের প্রতি নজর রাখাটাও কিন্তু নারীর ওপরেই বর্তায়। অথচ এই নারীটির মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটা থেকে যাচ্ছে অবহেলিত বা উপেক্ষিত।

একজন নারীকে একা একাই মোকাবিলা করতে হয় নিজের লড়াই এবং সংসারের বাকি মানুষগুলোর লড়াইকে। এই যে কঠিন বাস্তবতা, এর ভয়াবহতা জানে কেবল একজন নারী। নির্যাতনের কথা না পারে কোথাও প্রকাশ করতে, না পারে প্রতিকার চাইতে। জীবনে প্রথমবারের মতো নির্যাতনের সম্মুখীন হচ্ছে যেসব নারী, তাদের কাছে এই অভিজ্ঞতা একদমই আচমকা। তারা হয়তো কখনও ভাবেনি যে একদিন তাকেও মুখ খুলতে হবে স্বামীর বিরুদ্ধে। এই করোনাকাল আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছু। এই নির্যাতনের হাত হতে রক্ষা পাওয়ার উপায় খুব একটা সহজ নয়। আগেই বলেছি আমাদের স্থানীয় প্রশাসন এখন ব্যস্ত আছে করোনা মোকাবিলায়। এই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়টিকে তারা হয়তো স্রেফ একটি পারিবারিক ঘটনা বলেই বিবেচনা করছে। একজন নারী যখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে, তখন উপেক্ষিত থাকে পরিবারে থাকা তাদের সন্তানেরাও। এই অবস্থায় সৃষ্টি হয় সন্তানের জন্য এক ধরনের মানসিক নির্যাতনের মতো পরিবেশ।

সরকার ও প্রশাসন যদিও করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত এবং এটিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে সকল কার্যক্রম, তারপরও বলতে চাই নারী নির্যাতন বা নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকেও যেন সরকার তার নজরে রাখেন। প্রশাসনকে সঠিক নির্দেশনা দিতে হবে যেন কোনও এলাকায় বা জেলায় নারী নির্যাতনের ঘটনা উপেক্ষিত না থাকে। সকল প্রকার প্রশাসনিক সহায়তাকে সহজলভ্য করতে হবে, আর আইনি পদক্ষেপের বিষয়টিকেও সামনে আনাটাও জরুরি। যতগুলো নারী নির্যাতনের মামলা আছে সেগুলোকেও ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে সুরাহা করার পদক্ষেপ নিতে হবে। মিডিয়াগুলোর রয়েছে বড় ভূমিকা। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সমাজের সকল স্তর থেকেই নিতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

লেখক: কলামিস্ট

 

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: