বাল্যবিয়ের খবর প্রশাসনকে জানান না স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা!

 

বাল্যবিয়ের প্রতীকী ছবি

করোনাকালে অভিভাবকের কাজ না থাকা, সন্তানের স্কুল খোলার নিশ্চয়তা না থাকা এবং অনিরাপত্তা বোধ থেকে দেশে বেড়ে গেছে বাল্যবিবাহ। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাব বলছে, মে ও জুন মাসে আশঙ্কাজনক হারে বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি সামলাতে স্থানীয় প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ ঘটেছে যে এলাকায়, সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন, ‘কেউ অভিযোগ না করায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। মেম্বাররা কখনও নিজেরা জানতে পান না, আবার কখনও জানলেও আমাদের জানান না।’ এসব এলাকায় বাল্যবিবাহ রোধে কর্মরত সংগঠনগুলো বলছে, ভোটের রাজনীতির জন্য অনেক সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন। আবার আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যখন এ ধরনের বিয়ে ঠেকাতে যাই, তখন যে সবসময় তাদের সহযোগিতা পাই, এমনও না।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের জরিপ বলছে, দেশে জুন মাসে শিশু নির্যাতনের হার গত এপ্রিল ও মে মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বাল্যবিয়ের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের হিসাব বলছে, শুধু জুনেই ৪৬২ জন কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এ মাসে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা গেছে ২০৭টি। তবে এই বন্ধের ক্ষেত্রে সবসময় প্রশাসনের সহায়তা পাওয়া যায় বা নেওয়া হয় এমন নয়। তাদের হিসাবে গত মে মাসে বাল্যবিয়ের সংখ্যা ছিল ১৭০টি এবং বন্ধ করা হয়েছিল ২৩৩টি।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ব্র্যাকের গবেষণায় বাল্যবিবাহের যে কারণগুলো বেরিয়ে এসেছে, সেগুলো হলো—উত্তরদাতাদের ৮৫ শতাংশ বলছে, মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, ৭১ শতাংশ বলছে মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ৬২ শতাংশ বলছে, বাইরে থেকে আসা ছেলে হাতের কাছে পাওয়া। ব্র্যাক ১১টি জেলায় তাদের কর্ম এলাকায় ৫৫৭ জন নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এ সমীক্ষা করে। সমীক্ষায় নেতৃত্বদানকারী আন্না মিনজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জরিপ এলাকায় বাল্যবিবাহ আগের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেড়ে গেছে। আমরা বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছিলাম। এরমধ্যে বারবারই এসেছে যে বিষয়টি সেটি হলো—বাল্যবিবাহ দিয়ে দিয়েছেন বা চিন্তা করছেন এমন মা–বাবার ভাবনা হলো— এই করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে অর্থনৈতিক সংকট বাড়লে সন্তানকে ভরণপোষণে বেগ পেতে হবে।’

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর অর্পিতা দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘করোনাকালে বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়া নিয়ে আমরা শঙ্কিত। কেবল মেয়ে না, ছেলেদেরও বাল্যবিবাহ বেড়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে কাজ না থাকা। মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব, স্কুল কবে খুলবে তার অনিশ্চয়তা এবং অভাবের এই সময়ে বাড়তি একটা খাবারের জোগান থেকে অভিভাবকের মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষা।’ তাদের জরিপে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, সেখানে বরগুনার তালতলী এলাকার জেলে পল্লিতে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি জানা গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এ ব্যাপারে প্রশাসন সেখানে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে, এমন কোনও খবর তারা পেয়েছেন কিনা প্রশ্নে অর্পিতা দাস বলেন, ‘সবসময় যে প্রশাসন এগিয়ে আসে তা নয়। যে সংগঠনগুলো ওইসব এলাকায় কাজ করে, তারা নিজেরাই বন্ধ করতে উদ্যোগ নেয়। এমনকি স্থানীয় প্রতিনিধিরা জেনেও হয়তো এগিয়ে আসেন না।’

‘বাল্যবিবাহ বাড়ছে, কিন্তু অভাব অন্যতম কারণ না’, উল্লেখ করে নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের মাইন্ডসেটে সবসময়ই বাল্যবিবাহের দিকে আগ্রহী করে রাখে অভিভাবকদের। অন্য সময় মনিটর করা গেলেও এখনকার এই করোনা সময়ে ঠিকমতো খবরটাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সুযোগ বুঝে বিয়েটা করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ৩০টির মতো উপকেন্দ্রে ৩০টি হটলাইন আছে। আমাদের যে এলাকায় কাজ আছে, সেখানকার যা কিছু অভিযোগ ও আলোচনা এসব ফোন নম্বরে করতে পারবে। আমাদের কর্মীরা সরাসরিও যাচ্ছেন। ফোনের মাধ্যমেও খোঁজ-খবর করছেন।’ তিনি বলেন, ‘বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে অভাবটা একটা ব্যাপার। অনেক জায়গায় আমরা দেখেছি, একবেলা আহার কমাতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এটিকে প্রধান কারণ আমি মনে করি না। বরাবরই আমাদের সমাজে যৌতুক থেকে রক্ষা পেতে, অনিরাপদ বোধ থেকে বাল্যবিবাহ দেওয়ার প্রবণতা আছে। কেউ খোঁজ দিলে তবে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে—এটা ভাবার সময় এখন না। মেম্বার-চেয়ারম্যানরা নির্বাচন করে দায়িত্ব নিয়েছেন। তার এলাকায় সরকারের অবস্থানের বিরোধী কী কাজ হচ্ছে, সেই খবর রাখা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু তারা এই দায়িত্ব বেশিরভাগ সময় পালন করেন না। বিশেষ পরিস্থিতিতে তাদের প্রতি সরকারের বিশেষ নির্দেশনা যাওয়া উচিত ছিল।’

বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ‘বাল্যবিয়ে’ এবং ‘জোর করে বিয়ে’ বন্ধ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ উল্লেখ করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকারের উচিত স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিশেষ সার্কুলার দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে বন্ধ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বাল্যবিয়ে নিরোধ কমিটিকে কার্যকর করে তুলতে হবে।’

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের মতে, এসময়কালে বরগুনার তালতলী উপজেলায় বাল্যবিবাহ বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার কাছে এরকম কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসেনি, কেউ বলে নাই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যদি না আসে, সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। অভিযোগ এলে মেম্বার-চেয়ারম্যানদের সহায়তায় তা ঠেকানো যায়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আমি সোচ্চার।’ এটা প্রশাসনকে কারা জানাবে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সচেতন মানুষ জানাতে পারেন।’ এটা এলাকার চেয়ারম্যান বা মেম্বাররা জানাতে পারেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাদেরও খোঁজ রাখা উচিত। কিন্তু তারা হয়তো অনেক ক্ষেত্রে জানেন না, বা জানলেও বলেন না।  জানালে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।’

করোনাকালে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির কোনও অভিযোগ এখনও আসেনি উল্লেখ করে মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও কল্যাণ কর্মকর্তা) কামরুন নাহার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করছি। বাল্যবিবাহ বেড়েছে বা কমেছে— সেটা এখনই বলতে পারছি না। তবে করোনাকালে বাল্যবিবাহ ঠেকাতে করণীয় ও কী উপায় বের করা যায়, সেসব নিয়ে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ আমরা কালকে (সোমবার, ১৩ জুলাই) মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছি। প্রশাসনের পদক্ষেপ অবশ্যই আছে।’

 





সম্পূর্ণ রিপোর্টটি প্রথম আলোতে পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: