যেভাবে জনতার আরও কাছে যেতে চায় পুলিশ

 

পুলিশ (ফাইল ফটো)করোনা পরিস্থিতিতে সবাইকে যখন বেশি করে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে, সেই সময় মানুষকে সেবা দিতে রাস্তায় নেমে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন প্রায় অর্ধ শত। পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, করোনার মধ্যে বিভিন্নভাবে সেবা দিতে পেরে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা এবং জনতার পুলিশ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে এই বাহিনী। এই ভালোবাসা ও খ্যাতি ধরে রাখতে মানুষের আরও কাছাকাছি যেতে চান তারা। তাই ‘বিট পুলিশিংকে’ মানুষের কাছে যাওয়ার অন্যতম উপায় বিবেচনা করা হচ্ছে। বিট পুলিশিং ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্প্রসারিত করার কাজ এরইমধ্যে শুরু করে দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিট পুলিশিং এমন একটি কার্যক্রম, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। সেবা নিতে জনগণকে পুলিশের কাছে যেতে হবে না। পুলিশই জনগণের কাছে যাবে সেবা নিয়ে। এ ধারণা থেকেই বিট পুলিশিং সম্প্রসারণের কাজ শুরু করা হয়।

তারা জানান, এর আগে এই পদ্ধতি সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় প্রয়োগ করে বেশ সুফল পাওয়া গেছে। জঙ্গি তৎপরতা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, মাদক ব্যবসা, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, ইভটিজিং ও বাল্য বিয়ের মতো কাজগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এতে ওইসব এলাকায় পুলিশ সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। সেই ধারণা থেকেই বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনতার কাছে যেতে চায় পুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, বিট পুলিশের মূল কাজ হবে অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করে থানা পুলিশকে সহায়তা করা। এলাকায় অপরাধী কারা, কী ধরনের অপরাধ হচ্ছে এবং জামিনে বেরিয়ে এসে অপরাধীরা আবার একই অপরাধ করে কিনা, মাদক ব্যবসায়ী কিংবা জঙ্গিদের অপতৎরতাসহ নানামুখী অপরাধের দিকেও লক্ষ্য রেখে সেসব তথ্য থানাকে অবহিত করতে হবে বিট পুলিশকে। এছাড়া কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাও এর মাধ্যমে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর পাশাপাশি অপরাধীর তথ্য সংগ্রহে বিট পুলিশিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিট পুলিশিং কী

বিট পুলিশিং হচ্ছে একটি থানার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ। কাজের সুবিধার্থে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করে ২০১০ সালে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিট পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করে। বর্তমানে ডিএমপিতে পুলিশের তিন শতাধিক বিট রয়েছে। একজন সাব ইন্সপেক্টর (এসআই) কিংবা অ্যাসিসটেন্ট সাব ইন্সপেক্টরের (এএসআই) নেতৃত্বে তিন থেকে পাঁচজন কনস্টেবল দেওয়া হয় প্রতি বিটে। সরবরাহ করা হয় ক্রাইম নোট বুক। ক্রাইম নোট বুকের মাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবেদন নেবেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

২০১৭ সালে সিলেট রেঞ্জের বিভিন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়নে ‘সম্প্রসারিত বিট পুলিশিং’ নাম দিয়ে কাজ শুরু করেন তখনকার সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি কামরুল আহসান। তিনি ক্রাইম নোট বুকের পরিবর্তে নির্ধারিত ছকে মাসিক প্রতিবেদন নিতেন বিট পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে। এতে অপরাদ দমনে তিনি ব্যাপক সুফল পান এবং জনগণের কাছে প্রশংসিত হয় পুলিশ। সেই সফলতার ধারণা থেকেই এখন সারাদেশে স্থায়ীভাবে বিট পুলিশিং কার্যক্রম চালু করার কাজ শুরু করেছে পুলিশ সদর দফতর। এজন্য স্থায়ী কার্যপ্রনালী বা স্ট্যান্ডেন্টিং অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) তৈরির জন্য অতিরিক্ত আইজিপি কামরুল আহসানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়।

আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এসওপি চূড়ান্ত করে কাজ শুরু করে দেওয়া হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের কাছে জনগনের আশা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তা পূরণে বিট পুলিশিং একটি চমৎকার পদ্ধতি হবে বলে মনে করেন পুলিশ সদর দফতরের কমিউনিটি ও বিট পুলিশিং শাখার এআইজি সহেলী ফেরদৌস। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘জনগণের সেবা বাড়াতে বিট পুলিশিংকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার সাব ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তার প্রয়োজন হতে পারে। প্রত্যেকটি ইউনিয়ন পরিষদ ক্যাম্পাসে বিট পুলিশের একটি কার্যালয় থাকবে। যার দায়িত্বে থাকবেন সাব ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। সেজন্য বিট পুলিশিং পরিচালনায় স্ট্যান্ডেন্টিং অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) বা স্থায়ী কার্য প্রণালী তৈরির কাজ চলছে। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে এর খসড়া আইজিপির কাছে জমা দেওয়া হবে। তার অনুমোদনের পর চূড়ান্ত এসওপি তৈরি করে কাজ শুরু করে দেওয়া হবে।’

বিট পুলিশিং ব্যবস্থার এসওপি তৈরি কমিটির সভাপতি ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি কামরুল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসওপি তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করি আগামী সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত করে মাঠ পর্যায়ে বিট পুলিশের কার্যক্রম শুরু করা যাবে। বিট পুলিশিং ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক প্রত্যন্ত এলাকা রয়েছে মানুষ চাইলেই দ্রুত থানা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় থানা পর্যন্ত যেতে। আইনশৃঙ্খলাজনিত বড় ধরনের কোনও সমস্যার সৃষ্টি না হলে পুলিশও সেসব দূরবর্তী এলাকায় টহলে যেতে চান না। ফলে জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরুত্ব তৈরি হয়। সৃষ্টি হয় অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা ও ভুল বোঝাবুঝির। আর পুলিশের অনিয়মিত উপস্থিতির সুযোগে অপরাধীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রাম্য টাউট-বাটপারদের দৌরাত্ম বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিট পুলিশিং ব্যবস্থা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এসব অপরাধ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। মানুষের কাছাকাছি গিয়ে পুলিশ হতে পারবে জনতার।’

গত মাসে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘এমন একটি ব্যবস্থা চালু করতে চাই, যাতে জনগণকে পুলিশের কাছে আসতে না হয়। বরং পুলিশই জনগণের কাছে সেবা নিয়ে যাবে। আর সেই ব্যবস্থা হচ্ছে বিট পুলিশিং। সারাদেশে বিট পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করে আমরা মানুষের কাছে যেতে চাই। মানুষের হৃদয় জয় করতে চাই। করোনার সময় জনগণের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ধরে রাখতে চাই।’

আরও পড়ুন- 

মাদক-জঙ্গি দমনে যত কাজ বিট পুলিশের

 





সম্পূর্ণ রিপোর্টটি প্রথম আলোতে পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: