করোনাকালে অফিস

এই সময়ে অফিসে ঢুকেই ভালো করে হাত ধুতে হবে। ছবি: খালেদ সরকারকরোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রায় তুঙ্গ অবস্থাতেই নানা প্রয়োজনে খুলে গেছে অফিস–আদালত। চালু হয়েছে গণপরিবহন, সীমিত পরিসরে হলেও আমরা সবাই কমবেশি কর্মক্ষেত্রে যাওয়া–আসা শুরু করেছি। কবে এই মহামারি শেষ হবে, তা নিশ্চিত নয় বলে এই ‘নিউ নরমাল’ বা নতুন স্বাভাবিক অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই চলাচল করতে হবে আমাদের। সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে, সতর্ক থেকে সংক্রমণ প্রতিরোধের সব ব্যবস্থা নিয়ে শুরু করতে হবে কাজকর্ম। তার আগে জানা চাই, কেমন হবে সেই নতুন অফিস নীতিমালা?

প্রস্তুতি

সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলেছে যে ২৫ শতাংশ জনবল দিয়েই আপাতত অফিস–আদালত চলবে। তার মানে আগে যেমন প্রতিদিন সব কর্মী নিয়মিত হাজিরা দিতেন, এখন সেই চিরাচরিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। করতে হবে রোস্টার বা রুটিন, যাতে রোজ সবাইকে অফিস যেতে না হয়। সপ্তাহের একেক দিন একেকজন পালাক্রমে অফিস যাবেন আর বাকিরা বাসা থেকে দায়িত্ব পালন করবেন। এই রুটিনমাফিক কাজ চালিয়ে যেতে হবে আরও কিছুদিন।

ভিড় এড়াতে আর সবাই একসঙ্গে যাতে এক্সপোজড না হন, সে জন্যই এই নতুন ব্যবস্থা। তো যেদিন আপনার অফিস করতে হবে, সেদিন আপনি সকাল থেকে তৈরি হবেন অফিসে যাওয়ার জন্য। সকালের নাশতা অবশ্যই খেয়ে নেবেন, যেন অফিসে বেশি খেতে না হয়। আপনার লাগবে অবশ্যই একটা বা দুটো ভালো সার্জিকাল মাস্ক, যা ঠিকমতো ফিট হয়। স্বাস্থ্যকর্মী ও কোভিড রোগীর সংস্পর্শে না এলে সাধারণ তিন স্তরের কাপড় দিয়ে তৈরি বা সার্জিকাল মাস্কই যথেষ্ট। গ্লাভস লাগবেই, এমন কোনো কথা নেই, তবে অফিসে ফাইলপত্র, কাগজ, ডেস্ক স্পর্শ করার সময় পরলেই ভালো। তবে গ্লাভস পরা হাত কিন্তু কিছুতেই নাকে মুখে স্পর্শ করা যাবে না।

ভ্যানিটি ব্যাগ, মানিব্যাগ, ঝোলা এসব পরিহার করবেন। একটা প্লাস্টিকের ছোট ব্যাগে টাকাপয়সা, কার্ড, চাবি, সেলফোন নিয়ে পকেটে ব্যাগটা রাখুন। যদি দুপুরের খাবার নিতে হয়, তবে লাঞ্চবক্স আর পানির বোতলও নিন একটা পলিথিন বা কাপড়ের ব্যাগে। একটা ছোট হ্যান্ড স্যানিটাইজার সঙ্গে রাখুন। গণপরিবহন যেমন বাস, হিউম্যান হলার ইত্যাদি এড়িয়ে চলাই ভালো। সবচেয়ে ভালো হাঁটা। নিজের গাড়ি বা মোটরসাইকেল থাকলে সেগুলোও ভালো। অফিসের গাড়ি একসঙ্গে অনেকে ব্যবহার করে, তাই দূরত্ব বজায় রেখে বসতে হবে। গণপরিবহনে ওঠা-নামার সময় হাতে স্যানিটাইজার স্প্রে করার কথা, একটা সিট ফাঁকা রেখে বসার কথা। সিটগুলো নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করার কথা। এসব নিয়ম-কানুন ঠিকমতো তখনই পালিত হবে, যখন ভোক্তা হিসেবে আমরা সচেতন হব। বাসে ওঠার সারিতে দাঁড়ানোর সময় দূরত্ব বজায় রাখুন। কখনোই অন্য কাউকে বা কারও জিনিসপত্র স্পর্শ করবেন না। বাসের হাতল বা সিটের সামনের হাতল স্পর্শ করবেন না। নিজের গাড়িতে বা মোটরবাইকে ওঠার আগে হাতল, স্টিয়ারিং, কাচ নামানোর সুইচ ইত্যাদি জীবাণুমুক্ত করে নেবেন। চালকের পাশে না বসে পেছনে উল্টো দিকে বসুন। এসি না ছেড়ে জানালা খুলে দিন। চালক অবশ্যই মাস্ক পরবেন।

অফিসে সচেতনতা

লিফট যতটা সম্ভব পরিহার করাই ভালো। বিশেষ করে যদি অফিস সময়ে ভিড় থাকে। আর যদি ব্যবহার করতেই হয়, তবে নিয়ম হলো পরস্পরের দিকে পিঠ দিয়ে লিফটের দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো, লিফটের বাটন কনুই দিয়ে টেপার চেষ্টা করা। অফিসের দরজার হাতল স্পর্শ না করে ঢুকবেন। করোনার সময় কার্ড পাঞ্চ করা পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে অফিসগুলোকে। সব অফিসের প্রবেশমুখে বা নিচে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাইরে থেকে যিনি আসবেন, তিনি অবশ্যই হাত ধুয়ে ঢুকবেন। নিজের ফ্লোরে বা অফিসে প্রবেশ করার পরও প্রথমেই ওয়াশরুমে গিয়ে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন। তারপর ডেস্কে এসে প্রথমে ডেস্কের ওপরের তল, কম্পিউটারের কি-বোর্ড, মাউস, টেলিফোন ইত্যাদি স্যানিটাইজার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করুন।

এই সময়ে অফিসে একজন আরেকজনের ডেস্কে যাওয়া, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প করা নিষেধ। তিন ফুট দূর থেকেই কথা সারবেন বা প্রয়োজনে ডেস্কের ফোন ব্যবহার করবেন। কোনো সভা করতে হলে অনলাইনই এখন সবচেয়ে ভালো মাধ্যম। মিটিং উপলক্ষে অনেক মানুষ একত্রিত হওয়া যাবে না। এমন হতে পারে কেউ কেউ অফিস থেকে আর কেউ কেউ বাড়ি থেকে সভায় যোগদান করলেন। কাজের সময় মাস্ক কখনোই খুলবেন না, নাকের নিচে গলায় নামিয়ে রাখা যাবে না। একবার মাস্ক খুলে ফেললে তা ফেলে দিয়ে আরেকটা পরতে হবে, তাই দরকার হলে কয়েকটি মাস্ক রাখুন। মাস্ক ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেলে ফেলে দিতে হবে। মাস্ক পাল্টানোর সময় পেছনের ফিতায় হাত দিয়ে খুলবেন আর যথাযথ জায়গায় বর্জ্য ফেলবেন। চেষ্টা করবেন অফিসের কাপে, প্লেটে চা-নাশতা ইত্যাদি না খেতে।

দুপুরে খাওয়ার সময় ভালো করে হাত ধুয়ে নিজের আনা বক্স থেকে নিজের চামচ ব্যবহার করে দ্রুত খেয়ে নিন আর খাওয়ার পর হাত ধুয়ে আবার নতুন মাস্ক পরে নিন। যে মাস্কটি খুলে টেবিলে বা ডেস্কে রেখেছেন বা গলায় ঝুলিয়েছেন, তা দূষিত এবং আবার নাকে দেওয়া যাবে না। এর ফাকেঁও সারা দিন বেশ কয়েকবার হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন। ওয়াশরুম দূরে হলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করুন। গ্লাভস পরা হাতেও স্যানিটাইজার দেওয়া যায়। বিশেষ করে কোনো ফাইল বা কাগজপত্র স্পর্শ করার পর সঙ্গে সঙ্গে হাত জীবাণুমুক্ত করবেন।

বাড়ি ফিরে

বাড়ি ফেরার আগেই জানিয়ে রাখুন যাতে দরজাটা খোলা রাখা হয় আর বাথরুমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকে। বাসার দরজার কাছে একটা মুখঢাকা বিন রাখতে হবে। স্ট্রিপে হাত দিয়ে সাবধানে মাস্ক খুলে ওতে ফেলবেন। মাথায় ডিসপোজেবল ক্যাপ পরেন অনেকে, ওটাও ফেলুন। দরজার ভেতর একটা বাক্সে বা কনটেইনারে প্লাস্টিকের ব্যাগ উপুড় করে চাবি, টাকা, সেলফোন, চশমা ঢেলে দিয়ে প্লাস্টিকের ব্যাগটা বাইরের বিনে ফেলুন। খাবারের বক্স ভেতরে রেখে তার ব্যাগটাও ফেলুন, কাপড়ের ব্যাগ হলে হাতে রাখুন ধোয়ার জন্য। জুতাজোড়া অবশ্যই বাইরে রেখে আসবেন। পরে স্যানিটাইজার স্প্রে দিয়ে চাবি, চশমা, সেলফোন জীবাণুমুক্ত করুন। সব শেষে ঘরে ঢোকার আগে হাতের গ্লাভসটি সাবধানে খুলে বিনে ফেলে দিন।

বাথরুমে ঢুকে আগে হাত কনুই অবধি সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। তারপর গোসল করে নিন। ব্যবহৃত জামাকাপড়, মোজা, খাবারের ব্যাগ ইত্যাদি সাবান–পানিতে চুবিয়ে ধুয়ে ফেলুন। বাড়ি ফিরে নিজে ও নিজের জিনিসপত্র জীবাণুমুক্ত না করা পর্যন্ত আপনজনদের কাছে যাবেন না, কোনো চেয়ার বা বিছানায় বসবেন না।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হরমোন ও বিপাক বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

 





সম্পূর্ণ রিপোর্টটি প্রথম আলোতে পড়ুন

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: