চীন উদ্যোগী হলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব

আনিস আলমগীরবাংলাদেশ আশা করেছিল চীন মধ্যস্থতা করে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে তার বিরোধ মীমাংসা করে দেবে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালেও এটি ছিল চীনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার বৈঠকের অন্যতম প্রত্যাশা। বিষয়টিনিয়ে চীন সরাসরি প্রকাশ্যে কখনও মুখ খোলেনি, তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে আশ্বাস দিয়ে আসছে বরাবর। বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছে এটিকে আন্তর্জাতিক ইস্যু করার চেয়ে দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান করতে।
গত ২২ অক্টোবর চীন কিছুটা নীরবতা ভঙ্গ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, মিয়ানমার কথা দিয়েছে আগামী ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য তার জাতীয় নির্বাচনের পর চীন, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার একত্রে বসে সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নেবে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্টেট কাউন্সিলর ওয়াং ই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে আরও বলেন, মিয়ানমারের নির্বাচনের পর প্রথমত রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের মন্ত্রী পর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ধারণা করা হচ্ছে মিয়ানমারের ডি-ফ্যাক্টো শাসক এবং ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র‌্যাসি (এনএলডি) প্রধান, স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি ২০১৫ সালের মতো একচেটিয়া বিজয় অর্জন করে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসবেন। নির্বাচনটি মিয়ানমারকে বিশ্বের নির্বাচনী গণতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, তবে সরকার পরিচালনায় সামরিক জান্তার প্রভাব কমবে বলে কারও বিশ্বাস নেই। অন্যদিকে রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের জাতিগত সমস্যারও সমাধান দিতে পারবে না। গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) নতুন এক প্রতিবেদন অনুসারে, মিয়ানমারের নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটির কারণেই জাতিগত বৈষম্যের ফলে সৃষ্ট দশকের দশক চলা এই গৃহযুদ্ধ অমীমাংসিত থেকে যাবে।
জাতিসংঘের কাছেও এই নির্বাচন গুরুত্বহীন। জাতিসংঘ জানিয়েছে, মিয়ানমারের নির্বাচন যথাযথ মান পূরণ করতে ব্যর্থ হবে কারণ ২০১৫ সালের মতো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে থাকা এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান তাদের ভোট দিতে পারছে না। মিয়ানমারে মানবাধিকার তদন্তকারী জাতিসংঘের প্রতিনিধি থমাস অ্যান্ড্রুজ ২২ সেপ্টেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বক্তৃতাকালে যুক্তি দেন যে যতক্ষণ সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা হবে, ততক্ষণ নভেম্বরের এই নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ বিবেচনা করা যাবে না।
মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ উভয় রাষ্ট্রের বৃহত্তর প্রতিবেশী চীন এবং উভয় দেশে তার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। জেনারেল নে উইন ১৯৬০ সালে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখলের পর দীর্ঘদিন বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এবং চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে রাষ্ট্র চালিয়েছিলেন। বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিয়ানমারের ব্যাংকিং ব্যবস্থা পর্যন্ত স্থাপিত হয়নি। এলসি খুলে মিয়ানমার থেকে মালামাল আমদানির কোনও ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশও মিয়ানমার থেকে দ্রব্যসামগ্রী নগদ অর্থে ক্রয় করে থাকে। মিয়ানমার নিজেই নিজেদের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে রেখেছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উ কিয়াও থিন তিনদিনের জন্য ঢাকা সফর করেছিলেন। অক্টোবরের ২০১৬ থেকে জানুয়ারি ২০১৭ সালের মধ্যে নির্যাতনের ফলে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে ছিল। তার সফরের ৬ মাস পর ২০১৭ সালের আগস্টে গণহত্যার শিকার হয়ে আরও সাড়ে সাত লাখ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কিছু রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং চীনেও প্রবেশ করে। বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাই সম্ভবত বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম উদ্বাস্তু। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু ফলপ্রসূ কিছুই হচ্ছে না। রোহিঙ্গা জনস্রোতের পর ২০১৭ সালের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার জন্য মিয়ানমার গিয়েছিলেন, কিন্তু মিয়ানমারের অনাগ্রহের কারণে আলোচনা চূড়ান্ত ফয়সালা পর্যন্ত অগ্রসর হয়নি।
অবশেষে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার পরামর্শে গাম্বিয়া নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার বিচার চেয়ে মামলা করায় গত ডিসেম্বরে মিয়ানমারের শীর্ষ বেসামরিক নেতা অং সান সু চি হেগে হাজির হয়েছিলেন। সু চি আইসিজেতে নৃশংসভাবে গণহত্যা অভিযানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন এবং সামরিক জান্তাকে রক্ষা করে বলেন, এটি ছিল রাখাইন সেনাবাহিনী এবং রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’ ও সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যেকার ‘অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব’। তার যুক্তি রাখাইনে পুলিশ চৌকিতে যে নয় জন পুলিশকে রোহিঙ্গাদের অস্ত্রধারী গ্রুপটি হত্যা করেছে তার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি অবশ্য বলেন, সেনারা অন্যায়ের জন্য দোষী প্রমাণিত হলে তাদের শাস্তি দেওয়া হবে।
কিন্তু সু চি যে তা করবেন না এরমধ্যেই বুঝা যাচ্ছে। আইসিজে গত জানুয়ারিতে তার অন্তর্বর্তীকালীন রায় প্রদান করে মিয়ানমারের নেতৃত্বকে গণহত্যা প্রতিরোধের আইনি দায়বদ্ধতার প্রতি সম্মান জানাতে এবং রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন বন্ধে ‘তার ক্ষমতার মধ্যে যতটুকু সম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণ’ করার আদেশ দিয়েছিল। আদালত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে অপরাধের প্রমাণ নষ্ট না করার এবং এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করারও নির্দেশ দেন। মিয়ানমার সরকার আদালতে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেনি বা গণহত্যা বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য তদন্তও চালায়নি।
রাখাইনে মিয়ানমারের নৃশংসতার চিহ্ন হিসেবে গত ২৩ অক্টোবর গাম্বিয়া নতুন করে ৫০০ পৃষ্ঠারও বেশি দলিল দায়ের করেছে হেগের আদালতে। এরসঙ্গে রয়েছে ৫০০০ পৃষ্ঠারও বেশি সহায়ক উপাদান। মিয়ানমার সরকারের অবিলম্বে চলমান গণহত্যা রোধ এবং রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যার প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য আইসিজের আদেশের তত্ক্ষণাত মেনে চলা উচিত, বলেছেন ফরটিফাই রাইটস। সংগঠনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ম্যাথু স্মিথ বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের পক্ষে এটি আরেকটি পদক্ষেপ।’
এর আগে মিয়ানমারের গণহত্যায় অংশগ্রহণ করা দুই জন সেনা আদালতে উপস্থিত স্বীকারোক্তিমূলক সাক্ষী দেওয়ায় প্রতীয়মান হয় যে মিয়ানমারের আইনি লড়াই খুবই দুর্বল হয়ে গেছে। সম্ভবত সেই কারণেই তারা চীনকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তাদের জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ত্রিদেশীয় বৈঠকে বসবে। বরাবরই মিয়ানমারের পক্ষে চীন ভেটো দেওয়ায় জাতিসংঘ ইয়াঙ্গুনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে না, কিন্তু আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মিয়ানমার মানতে বাধ্য হবে।
মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালাচ্ছে যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের লোক নয়, তারা বাংলাদেশ থেকে রাখাইনে প্রবেশ করে বসতি করেছে—মিয়ানমারের এই অভিযোগ প্রমাণ করা এত সহজ হবে না। রাখাইনের পুরনো নাম আরাকান। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৫৫ থেকে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে আরাকান তার স্বাধীন সত্তা, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সত্তা, স্বাতন্ত্র্যতা নিয়ে নিজ বৈশিষ্ট্যে উজ্জীবিত একটি এলাকা। ব্রিটিশরা যেই নৃগোষ্ঠীর তালিকা দিয়েছে তাতে রোহিঙ্গাদের নাম নেই বলে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করার বাহানা খুঁজছে মিয়ানমার। ব্রিটিশরা ‘বার্মিজ মুসলিম’ শব্দটি ব্যবহার করেছে, তারা ১৩৫টি নৃগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলিমদের নাম উল্লেখ করেননি বলে ৩০ লাখ লোকের একটি সম্প্রদায় হারিয়ে যেতে পারে না। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে ১৩৫টি নৃগোষ্ঠীর সবাই বিদ্রোহী, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সবার সমস্যা রয়েছে।
মিয়ানমার ও আরাকানের মাঝখানে সুদীর্ঘ বিশাল ইয়োমা পর্বতমালা। চট্টগ্রামের সঙ্গে আরাকানের যে ভৌগোলিক নৈকট্য সেটি মিয়ানমারের সঙ্গে নেই, এজন্যই ইতিহাসে দেখা যায় চট্টগ্রাম ও আরাকান এক রাজ্য কাঠামোতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ছিল।
আরাকানের প্রধান নদীর নাম ‘কালাদান’। কালাদান বার্মিজ ভাষার শব্দ। ‘কালা’ অর্থ বিদেশি, ‘দান’ অর্থ বিদেশিদের জায়গা। চার হাজার বছরের মধ্যে বার্মার সম্রাট শুধু একবার অল্প সময়ের জন্য আরাকানকে কব্জা করতে পেরেছিল। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বার্মা উপমহাদেশের অংশ ছিল। ব্রিটিশরা শাসন কাজের সুবিধার জন্য ১৯৩৭ সালের পহেলা এপ্রিল নাফ নদীকে সীমানা সাব্যস্ত করে বার্মাকে ভারত থেকে পৃথক করে। ১৯৩৭ সালে পৃথক না হলে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা প্রদানের সময় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আরাকানকে পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করে দিতো।
যাহোক, বাংলাদেশ এখন অতীত ঘেঁটে আরাকান দাবি করছে না। বাংলাদেশের দাবি আরাকানের অধিবাসীগুলোকে তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়ে তাদের জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। গত ২২ অক্টোবর ইউএনএইচসিআর, ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে একটি ভার্চুয়াল সম্মেলনে দাতারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য আরও ৫৯৭ মিলিয়ন ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চীন, রাশিয়া আমন্ত্রিত হলেও অংশ নেয়নি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সেখানে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ আর এই বোঝা চালিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থানে নেই। রোহিঙ্গাদের অবশ্যই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে হবে। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, তারা এখানে কেবল অস্থায়ী ভিত্তিতে রয়েছে।’
রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা নিরপেক্ষ নয়। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের পক্ষে মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা দুরূহ, কিছুদিন আগেও তারা জাতিসংঘে মিথ্যাচার করেছে যে রোহিঙ্গাদের তারা নিতে চায় কিন্তু বাংলাদেশ পাঠাতে চায় না। তারপরও একদিকে গাম্বিয়ার মামলার অগ্রগতি, অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিদেশীয় বৈঠক—দুটি মিলে ফলপ্রসূ কিছু হয় কিনা দেখার জন্য রোহিঙ্গাদের আরও অনেক অপেক্ষা করতে হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকেও, যার নাভিশ্বাস হয়ে আছে এই শরণার্থী সমস্যাটি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: