রাজনীতি চালু থাকুক ষড়যন্ত্র নয়

মাসুদা ভাট্টিকরোনা-অতিমারিতে দিশেহারা বিশ্ব যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন বাংলাদেশের প্রাদুর্ভাব যেমন বেড়েছে তেমনই একের পর এক সংকট দেশটিকে চারদিক থেকে যেন ঘিরে ধরেছে। এরমধ্যে নতুন করে বন্যার কবলে পড়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও কতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে যাচ্ছে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা না গেলেও একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সামনে খুব ভালো কোনও কিছু আশা করার নেই। যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দেশে একাধিকবার নেমে আসা প্রচণ্ড প্রাকৃতিক দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে হিসেবে করোনাজনিত ক্ষতিসহ বন্যার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে সরকার সামলে উঠতে পারবে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করছেন। কিন্তু করোনা-অতিমারি, বন্যা, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামায় বাংলাদেশের রফতানি খাতে তার প্রভাব পড়া এবং ঘরের কোণে দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্র ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার ফলে বাংলাদেশে সরকারবিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিবর্গ এমনভাবে নড়েচড়ে উঠেছে যে বিভিন্ন ফ্রন্টে তাদের ‘মুভমেন্ট’ দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পক্ষে এটা অনুমান করা খুবই সহজ, তারা এবার আটঘাট বেঁধেই মাঠে নামতে চাইছে সরকার পরিবর্তনে বা তাদের ভাষায় ‘সরকারকে ফেলে দিতে’।

একথা সত্য, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রথমেই পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিয়ে সরকার ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল, তা গত বারো বছরে কয়েক মাস পর পরই কেবল বলবৎ ছিল তাই-ই নয়, বেশ কয়েকবার একেবারে কানের পাশ দিয়ে গুলি যাওয়ার মতো সরকার নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে, তার মানে এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলাতেও সরকার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। প্রশ্ন হলো, এসব অভিজ্ঞতা অর্থাৎ বারবার অর্থনীতি ও রাজনীতিকে সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র কিংবা শত্রুপক্ষ যাই-ই বলি না কেন তাদের সামলে করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশকে নতুন করে দাঁড় করানোয় আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা সরকার কতটা সফল হবে বা আদৌ সফল হবে কিনা, তার ওপরই কিন্তু নির্ভর করছে বাকি বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেরও নতুন ভবিষ্যৎ– আন্তর্জান্তিকভাবে যাকে ‘নিও-নরমাল’ বা ‘নুতন-জীবন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। তাই শুরুতেই একথা বলে নেওয়া জরুরি, ষড়যন্ত্রের যেকোনও ফলাফলই কোনও দেশের জন্য শুভকর কিছু এনেছে বলে প্রমাণ নেই। বরং বাংলাদেশের মতো দেশ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে দীর্ঘসময় ধরে তার মূল্য দিতে হয়েছে দেশের জনগণকে, এরকম প্রমাণ একাধিক দেওয়া যেতে পারে।
কোভিড-১৯ ভাইরাস দেশে দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ত্রুটিকে যেমন উন্মুক্ত করেছে, তেমনই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে যে দুর্নীতির বাসা দীর্ঘকাল ধরে স্থায়িত্ব লাভ করেছে তা মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কখনও স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাধান্য দেয়নি, বরং এই মৌলিক অধিকারের জায়গাটিকে বারবারই মানুষের ব্যক্তিখাতের ওপর ছেড়ে দিতে চেয়েছে। ফলে যার অর্থ আছে তার পক্ষেই চিকিৎসাসেবা গ্রহণ সম্ভবপর হয়েছে, আর যাদের নেই তাদের জন্য বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুই ছিল একমাত্র পথ। করোনা-অতিমারি মানুষের এই অসহায়ত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে সরকার বাধ্য হয়েই এই খাতে চলা দুর্নীতির লাগাম টানা চেষ্টা করে। কিন্তু আসলে দেরি ও ক্ষতি দু’টোই যা হওয়ার তা এরইমধ্যে হয়ে গেছে, এক যুগ ধরে দেশ চালানোর পর এই ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’-ধরনের বুলিতে আর কাউকে ভোলানো যাচ্ছে না। দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি থাকলে এই অচলাবস্থা দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হতে পারতো। কিন্তু সেটা হচ্ছে না, হচ্ছে সরকার ফেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র।
কেন এরকমটা হচ্ছে? কারণ বাংলাদেশে আওয়ামী-বিরোধী হাজারটা প্ল্যাটফরম থাকলেও নেই কার্যকর কোনও বিরোধী রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তার বিরোধিতা করার মতো রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে নেই, কারণ বিরোধী দল হিসেবেও আওয়ামী লীগ নিজেদের যে উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছে বাংলাদেশের আর কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে সেটাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। একমাত্র ষড়যন্ত্র ও অপরাজনৈতিক কৌশল দিয়েই বরাবর আওয়ামী লীগকে মোকাবিলার চেষ্টাটা বঙ্গবন্ধুর আমলে যেমন ছিল, এখনও তেমনই রয়েছে, এর কোনও হেরফের হয়নি। সামরিক, বেসামরিক আমলাতন্ত্র, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরাই এখনও আওয়ামী-বিরোধী রাজনীতির এখনও মূল অস্ত্র। এই সময়েও সরকার যখন দেশের করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, অর্থনীতি যখন দুর্বল হচ্ছে ক্রমশ, দুর্নীতি দমনে সরকার নিজেই আগ্রহী হয়েও মানুষকে ঠিক ‘কনভিন্স’ করতে পারছে না, তখন বিরোধী রাজনীতি নয়, বরং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র এই পরিস্থিতিতে কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করছে সরকার-বদলের। অর্থাৎ রাজনীতি নয়, আবারও ষড়যন্ত্র হয়ে উঠছে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টার মূল অস্ত্র, যা সত্যিই ভয়ংকর।
কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথমত করোনা-অতিমারির পুরো সময়ে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করার এক কারবালা, মিথ্যেকে কী কৌশলে সত্য হিসেবে প্রমাণ করা যায় তার প্রতিযোগিতা চলছে সর্বত্র। এরমধ্যে প্রতিবেশী ও সরকারের বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সরকারের আরেক অর্থনৈতিক-বন্ধু চীনের যুদ্ধাবস্থা যেন এই ষড়যন্ত্রীদের জন্য রাজনৈতিক বসন্ত এনে দিয়েছে। প্রথমত তারা এর মধ্যে বাংলাদেশকে জড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার নতুন পথ ধরেছে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে চীনের সঙ্গে সরকারের নৈকট্যকে ‘হাইলাইট’ করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বন্ধুত্বের শর্ত হিসেবে জুড়ে দিতে চাইছেন বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলকে ভারত যেন আর সমর্থন না দেয় সে বিষয়টি।
এ নিয়ে বিস্তারিত আরেক দিন লেখা যাবে কিন্তু এই মুহূর্তে আরও একটি পক্ষ দেশে-বিদেশে সর্বত্র ভারত-বিরোধিতা উসকে দিয়ে সেই ‘বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বিকিয়ে দেওয়া’-র পুরনো প্রচারণা আরও জোরেশোরে শুরু করেছেন। এবার এর সঙ্গে তারা যুক্ত করছে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকেও। বাংলাদেশের প্রতিটি নিয়োগ ভারতের কথায় হয়, এটুকু বলেই তারা খান্ত না দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তিকে বিতর্কিত করতে ‘চট্টগ্রাম বন্দরে বাংলাদেশি জাহাজের আগে ভারতীয় জাহাজ খালাশ হবে’ প্রচারণা চালিয়ে ভারত-বিরোধী উস্কানি অব্যাহত রেখেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বিষয়টি সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজখবর করে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক নৌ-বন্দর ব্যবহারের সকল নিয়ম-কানুন মেনে, প্রতিটি জাহাজের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘ট্যারিফ’ বা অর্থ পরিশোধপূর্বক জাহাজ থেকে জিনিসপত্র খালাশ করার মাধ্যমেই দুই দেশের মধ্যে হওয়া ‘ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি’ কার্যকর করা হবে, যার পরীক্ষামূলক প্রথম জাহাজ ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামে এসেছে। আমরা নিঃসন্দেহে সরকারের এই চুক্তি নিয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি আশা করতে পারি, সংসদে চুক্তিটি উত্থাপনের দাবি জানাতে পারি, এমনকি এই নিয়েও বিতর্ক চলতে পারে, এতো কম পরিমাণ ‘ট্যারিফ’ কেন ধার্য করা হলো? কিন্তু সেটা না করে ষড়যন্ত্রীদের সবচেয়ে প্রিয় ও পুরনো কৌশল ‘ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দেওয়া’র পথেই হাঁটছে তারা। এমনও প্রচারণা চলছে, চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের রাজনৈতিক দলকে ইসলামিক মতাদর্শের দলের সঙ্গে একত্রিত করে সরকারবিরোধী নতুন মঞ্চ প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে (আমার মতে এটা সব সময়ই ছিল বাংলাদেশে)। ওদিকে নতুন নতুন কয়েকটি রাজনীতির-ঘোষণাকে একত্রিত করে করোনা-পরবর্তী কিংবা তার আগেই সরকার পরিবর্তনের জন্য দেশের ভেতরকার পরিস্থিতিকে অশান্ত করে তোলার কথাও প্রচারণায় আসছে।
সব মিলিয়ে এদের একটাই উদ্দেশ্য, আর তাহলো আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো। আওয়ামী লীগকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসানো হবে কাকে? এ বিষয়ে অবশ্য ‘নানা মুনি নানা মত’। তবে প্রাথমিক কাজ হিসেবে লক্ষ্য একটিই, আওয়ামী লীগকে সরানো, তারপর কলাগাছ পাওয়া গেলে তাও চলবে বিষয়টা অনেকটাই এরকম।
আগেই বলেছি, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন বিরোধী রাজনীতিতে আমরা এতোটাই আকাল দেখতে পাই যে, সরকারের চরম অ-কাজেও প্রতিবাদ কিংবা জনগণকে সম্পৃক্ত করার মতো কোনও রাজনৈতিক দলকে কার্যকর দেখা যায় না। এই সময়ে বিষয়টি আরও লক্ষ্যমান এ কারণে, সংসদের ভেতরে ও বাইরে একাধিক বিরোধী দল থাকলেও জনগণের কথা ভাবে কিংবা জনগণের জন্য কাজ করে এমন কাউকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই দেশের ও দশের কল্যাণের কথা ভেবে আওয়ামী লীগ সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছেন, প্রতিবাদ করছেন কিন্তু এদের সম্মিলিত বা রাজনৈতিক ‘ভয়েস’ বা ‘প্ল্যাটফরম’টা অনুপস্থিত। কিন্তু তাদের বাইরে যারা দেশে-বিদেশে সরকার-বিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছেন তারা মূলত অস্থিরতা, অরাজকতা সৃষ্টি এবং প্রয়োজনে রক্তপাতের মাধ্যমে ‘সরকার ফেলে দেওয়ার’ চেষ্টায় রত। তারা ভুলে যান, এর ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিটাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এক পঁচাত্তরের ষড়যন্ত্র দেশকে আজকের দুরবস্থায় এনে ফেলেছে, সেখান থেকে এই ষড়যন্ত্রীরা মোটেও শিক্ষা নেননি; নেওয়ার কথাও নয় কারণ তারা ৭৫-এর হত্যাকাণ্ডকে বৈধ মনে করে থাকে।
এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের দুর্বলতা অনেক, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের ভেতরে ও বাইরে বহু প্রকারের আগাছার জন্ম হয়েছে, তারা বেড়েছে, ফুলেছে, ফেঁপেছে- খুব সহজে তাদেরকে উপড়ানো সম্ভব হবে না। কিন্তু দলটি চেষ্টা করছে, সেটা জনগণ নিশ্চয়ই বোঝে। স্বাভাবিকভাবেই এই ষড়যন্ত্রীরা সরকারকে সে সুযোগ দিতে চায় না। তারা চায় অস্থিরতা, অরাজকতা, রক্তপাত এবং যে কোনও প্রকারে ক্ষমতার পালাবদল। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এই ষড়যন্ত্রীরা কেবল আওয়ামী লীগের শত্রু নয়, তারা আসলে দেশ ও দশেরও শত্রু। একে তো করোনার আঘাত, তার ওপর বন্যা, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা—এই সময় অন্য যেকোনও দেশেই ক্ষমতাসীন সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আগে দেশের অবস্থা ফিরিয়ে আনার কাজটিই হতো প্রকৃত নাগরিক দায়িত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে যারা এই মুহূর্তে নাগরিক দায়িত্ব পালনের নামে আসলে দেশের ধ্বংসকে ডাকতে চাইছেন তারা কোনোভাবেই দেশপ্রেমিক নন, জনদরদি তো ননই, বরং তারাই প্রকৃত গণদুশমন। আশার কথা হলো, বাঙালি আর যাই-ই হোক, শত্রু চিনতে কখনও ভুল করেনি।
লেখক: সাংবাদিক
[email protected]

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: