বাড়িভাড়া এবং মধ্যবিত্তের অন্যান্য করোনা সংকট

আনিস আলমগীরগত চার মাসব্যাপী করোনার কারণে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষ্প্রাণ হয়ে যাচ্ছে। শুরুতে প্রায় বন্ধ থাকলেও এখন সরকার দোকানপাট সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আবার নিত্যপণ্যের দোকানিরা বলছেন, লকডাউনের কয়েক ঘণ্টার সময়সীমার মধ্যে যেটুকু বিক্রি হয়েছে, এখন দোকানপাট  দীর্ঘ সময় খোলা থাকলেও বেচাকেনা কম। সন্তোষজনক বিক্রি না হওয়ায় অন্যান্য পণ্যের দোকানদারদের মধ্যেও ব্যাপক হতাশা। অনেক দোকানি আবার ঠিকমতো দোকানই খুলছেন না। কর্মচারীর বেতন, দোকানভাড়া পরিশোধ করা দোকানদারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কেউ কর্মচারী বিদায় করে দিয়েছেন। পূর্বে যেখানে ছিল পাঁচ জন কর্মচারী, সেখানে দুই-তিন জন রাখা হচ্ছে।
গরিবদের কথা চিন্তা করে সরকার নানা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আগের ১০ টাকা দরে চাল বিক্রির কর্মসূচির সঙ্গে সরকার এখন তাদের ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে, নগদ অর্থ দিচ্ছে। এখনও অনেক গরিব এসব পেয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা তার হিসাব দিতে গিয়ে বলেছেন ২ জুলাই পর্যন্ত, ২ লাখ ১১ হাজার ১৭ মেট্রিক টন চাল,  ৯৫ কোটি ৮৩ লাখ ৭২ হাজার ২৬৪ নগদ টাকা এবং ২৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা শিশু খাদ্য সহায়ক হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর সিংগভাগ ইতিমধ্যে বিতরণও করা হয়েছে, যাতে আনুমানিক ১০ কোটি মানুষের কাছে একটা নয় একটা কিছু গিয়েছে।

মধ্যবিত্তরা পড়েছে চরম বিপাকে। শিক্ষক, সাধারণ দোকানি, বেসরকারি চাকরিজীবী, এরাই হচ্ছে মধ্যবিত্ত। এরাই কিন্তু অর্থনীতির প্রাণশক্তি। এরা করোনার কারণে অর্থনৈতিক দুরবস্থায় এখন শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ইত্তেফাক লিখেছে, মধ্যবিত্তের জীবন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। ৩৬ শতাংশ মধ্যবিত্ত শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছে।

আমরা দেখেছি সাধারণত মধ্যবিত্তরা গ্রাম থেকে শহরে আসে। আয় রোজগার করে জীবন পরিচালনা করে। তারা তাদের সন্তানদের শহরের ভালো স্কুলে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। কারণ গ্রাম-গঞ্জের স্কুলে শিক্ষার যে বেহাল অবস্থা, তাতে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই চিন্তিত। আগে বোর্ডের পরীক্ষায় গ্রাম-জেলা পর্যায়ের স্কুলের বহু শিক্ষার্থী মেধা তালিকায় স্থান পেতো। এখন সেটা নেই। গ্রামের স্কুলের অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার বেহাল দশা। কারণ স্কুল-কলেজ জীবনে যারা ছিল লাস্ট বেঞ্চার তারাই এখন গ্রাম-গঞ্জের স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। সেখানে পোস্টিং পাওয়া সরকারি কর্মকর্তারা ওইসব স্কুলে তাদের সন্তানদের পড়াতে দেন না। তাদের সন্তানরা লেখাপড়া করে শহরের স্কুলে, পরিবারও থাকে শহরে। সুতরাং তারাও গ্রামের স্কুলে কী শিক্ষা দেওয়া হয়, তার নজরদারি জরুরি মনে করেন না।

মধ্যবিত্ত শহর ছাড়ছে কারণ তাদের আয়-রোজগার অনিশ্চিত হয়ে গেছে। চাকরি চলে গেছে, পেশা হুমকির মধ্যে পড়েছে। সুতরাং সন্তানদের স্কুলের খরচ, বাসাভাড়াসহ শহরে থাকার খরচ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে মধ্যবিত্তরা গ্রামে চলে যাচ্ছে অথবা পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এমনকি যারা শহরতলীতে থাকতো তারাও সেসব এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া তো মওকুফ করবে না! মাস ফুরালেই ভাড়ার তাগিদ দেবে। না দিতে পারলে অপমান করবে। সুতরাং ইজ্জত যাওয়ার আগে ইজ্জত বাঁচানোর ব্যবস্থাই উত্তম।

ঢাকা শহরে এমনিতেই ঘরভাড়া বেশি। পৃথিবীর বহু দেশের রাজধানীর তুলনায় এটা বেশি। ভাড়া সম্পর্কে কোনও নিয়মনীতি কখনও মানা হচ্ছে না। কিছু আইন করা হয়েছে সত্য এবং তাতে ভাড়াটিয়াদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে বলাও হয়েছে, কিন্তু সবই কাগজে কলমে। ঢাকা শহরের ঘরভাড়ার এই তুঘলকি কাণ্ড আদিকাল থেকে বিরাজমান। ঘর ভাড়ার নিয়মশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কোনও উদ্যোগ কখনও ছিল না, এখনও নেই। সিটি করপোরেশন এখানে নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়। তারা ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ শোনার দায়িত্ব নেয়নি, তবে বাড়িওয়ালা থেকে ট্যাক্স নেওয়ার দায়িত্ব তাদের মধ্যে রেখেছে।

মধ্যবিত্তকে সবচেয়ে বেশি অপ্রস্তুত করে তুলেছে এই বাড়িভাড়া। মাসিক আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ার পেছনে। মিডিয়াও এই নিয়ে যতটুকু সরব হওয়ার তা না হয়ে চুপ করে আছে। বরং ভাড়াটিয়া হারিয়ে  বাড়িওয়ালারা ‘দুঃখের সাগরে পড়েছেন’ এই জাতীয় কাহিনি পড়ছি গত এক সপ্তাহ ধরে। বাড়িভাড়া কমিয়ে দিলে দু’পক্ষের যে সমস্যার সমাধান হয়, সে কথা আজও কাউকে বলতে শুনলাম না।

অনেক দেশের সরকার করোনার মধ্যে জনগণকে নগদ টাকা সাহায্য দিচ্ছে। অনেক রাষ্ট্রে বাড়িভাড়া ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। বাসভাড়া কমিয়েছে, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের দাম কমিয়েছে।

উন্নত দেশ বাদ দেন, আমি ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতির একটি দেশ গ্রিসের উদাহরণ দিতে পারি এই ক্ষেত্রে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা বাসাভাড়া ও দোকানভাড়া ৪০ শতাংশ কমিয়েছে। বাস এবং ট্রেন ভাড়া কমিয়েছে ২০ শতাংশ। ইলেকট্রিক/গ‍্যাস/পানি/পৌরসভার কর কমিয়েছে ২০ শতাংশ করে। খাদ্যের ওপর ভ্যাট ১৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে করেছে ৬ শতাংশ। তেলের দাম কমিয়েছে ৩০ শতাংশ। মহামারিকালীন বেকার ভাতা চলমান রয়েছে ৮০০ থেকে ৫৩৪ ইউরো। ব‍্যবসায়ীদের জন্য রয়েছে ১ শতাংশ সুদের হারে ঋণ সহযোগিতা। এখানে শেষ নয়, গণমাধ্যমকে ইতিমধ্যে ৩০ মিলিয়ন ইউরো সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের ব্যয় কমানো দূরের কথা বরং বাসভাড়া বেড়েছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে পানির দাম বাড়াচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। বাজারের পণ্যের দাম বেড়েছে, অত্যধিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভোগান্তি বেড়েছে। তার সঙ্গে বাড়তি খরচ হিসেবে যোগ হয়েছে করোনা প্রতিরোধে মাস্ক, স্যানিটাইজার কেনা এবং চিকিৎসা ব্যয়। আর এসবের সবক’টির সরাসরি শিকার মধ্যবিত্ত।

অথচ সরকারের উচিত ছিল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত করোনাকালে বাসাভাড়া ও দোকানভাড়া যার যার বর্তমান রেট থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া। উচিত ছিল বাড়ির মালিকদের জন্যও এই সংক্রান্ত সরকারি ট্যাক্স সমানহারে কমিয়ে দেওয়া, তাদের বাড়ির বিপরীতে যদি ব্যাংক লোন থাকে সেটা পরিশোধে বিনা জরিমানায় সময়সীমা বাড়ানো। তা না হলে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো শহর ছেড়ে যেভাবে মধ্যবিত্ত পালাচ্ছে তাতে সহসা মধ্যবিত্ত প্রায় শূন্য হয়ে যাবে শহর দুটি। শুধু বড়লোকদের জন্য প্রণোদনা আর গরিবদের সাহায্য দিলেই হবে না। অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে হলে মধ্যবিত্তের কথা ভাবতে হবে সবার আগে। মনে রাখা উচিত মধ্যবিত্তরা অর্থনীতির প্রাণ স্পন্দন।

এদেশের লোকসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ মধ্যবিত্ত। তাহলে মধ্যবিত্তের সংখ্যাটা দাঁড়ায় চার কোটির ওপরে। তারা সংখ্যায় বিশাল, কিন্তু অসংগঠিত। এদের কোনও সংগঠন নেই, তাই এদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। মধ্যবিত্তরা তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ব্যাংকে, ডাকঘরে রেখেছে এবং সেখান থেকে যে সুদ পায় তা তাদের সংসার খরচে যোগ হলে ভালোভাবে চলতে পারে। এখন বড়লোকদের ঋণের টাকার সুদ কমানোর জন্য মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের লাভ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে সরকারের সব চিন্তা বড়লোকদের জন্য আর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য। মধ্যবিত্তের জন্য কেউ নেই, মধ্যবিত্তের জন্য কিছুই রইলো না।

এত বড় মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী পথে বসে গেলে তো জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে। করোনার কারণে অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা এসেছে তাতেই তাদের জীবনের গতিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তাদের প্রতি যদি নজর না দেওয়া হয়, তাহলে পুরো মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী অচল হয়ে যাবে। আমার মনে হয় করোনাভাইরাস দীর্ঘায়িত হলে তারা একটা অচলায়তনের মুখোমুখি হবে।

সামষ্টিক অর্থনীতি বলছে মানুষের ব্যয়ের সামর্থ্য আরও সংকুচিত হবে। এতে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা আরও প্রকট হবে এবং একের পর এক কোম্পানি দেউলিয়া হবে। অর্থনীতির সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলবে। আর্থিক প্রণোদনায় পাহাড়সম অর্থ ঢালা হচ্ছে, তাতে সমস্যার বড় ধরনের কোনও সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে না। আর এভাবে অব্যাহত প্রণোদনা দেওয়াও সম্ভব নয়। সুতরাং এখন আমরা আরও বহুদিন করোনার ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে যাবো। এই কথা মাথায় রেখেই সরকার আর্থিক পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস না করলে, বিশৃঙ্খলা সবকিছুকে গ্রাস করবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

 





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: