মিথের ঘোড়া; একটি পাঠ ও প্রতিক্রিয়া

 

প্রচ্ছদের ঘোড়াটিকে দেখেই চড়ার লোভ হয়েছিল। ঘোড়ায় চড়িনি কখনো নিজে। তবু ঘোড়াটিকে আটকালাম। কে জানতো এটি অশ্বমেধের ঘোড়া। ঘোড়ার মালিক যে বার্তাগুলো পাঠিয়েছেন কবিতায় তার মর্মোদ্ধার করতে ঘেমে গেলাম। এই গলদঘর্মে কোনো গলদ নেই। ঘোড়ায় গলদ ভাবলে সেটি গোড়ায় গলদ। ঘোড়াটিকে আমার চেনা মিথের নাগালে পাইনি পুরোপুরি। রাজু তার মিতভাষ কবিতার ভায়োলিনে যে মিথভাষ পড়িয়েছেন আমি পুলকিত। পাঠক সম্পন্ন হবেন।

কবি বিষ্ণু দে কবিতায় ইউরোপের মিথগুলোকে এনেছিলেন। বাংলার তথাকথিত রেনেসাঁস আমাদের চিনিয়েছে বিশ্বমানের যা কিছু ইউরোপের, আর আমরা রানির প্রজাদের কাছে ইংরাজির। অথচ মিথের আরবি ঘোড়াটি একদিন ইউরোপকে আলো করেছিল। রাজু সেই অশ্বের পিঠে সওয়ার। আরব বিশ্বের প্রাচ্যের এই ঘোড়াটি আমাদের কবিগুরুরও চোখে পড়েছিল। সাধে কি আর লেখেন—‘ইহার চেয়ে হতাম যদি আরব বেদুইন।’

রাজু সেই কবিগুরুর কাঙ্ক্ষিত যাত্রায় সামিল। উত্তরসূরিকে তিনি উসকানি দিয়েছেন। রাজু সেই দায়িত্ব স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে তার যোগ্যতা জন্মলব্ধ। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ যে সেমেটিক আবেগে কবরে এক মুঠো মাটি চেয়েছিলেন রাজু সেই সেমেটিক চিন্তাচর্চায় মানুষ হয়েছেন। নিজে সফর করেছেন। তাই তার মিথের ভুবন আগডুম বাগডুমের ঘোড়াডুমটিকে ছুটিয়ে দিয়েছেন ব্যাবিলন এবং তাবৎ মরুবিশ্বে। রাজুর এই সহজাত উত্তরাধিকার আমার কাছে সহজ নয় বলেই তাকে আমি হিংসা করি। হিংসা করি বলেই আত্মস্থ করার প্রয়াস পেয়েছি। এ হিংসা পাপ নয়।

প্রসঙ্গত আমার প্রিয় প্রবাদপ্রতিম কথাকার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ হরফ প্রকাশনীর মিলন দত্ত সম্পাদিত ‘মুসলমান সমাজের পঞ্চাশটি গল্প’র ভূমিকায় যে মূল্যবান কথাগুলো বলেছিলেন হুবহু শুনিয়ে দিই—‘এ দেশে জন্মসূত্রে মুসলিম হওয়ার একটা বড় লাভ অনেকগুলো সংস্কৃতির উত্তরাধিকার অর্জন। একজন নিরক্ষর মুসলিম ইসলামী সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি বলতে যা বোঝায় তা দুটোই বোঝেন। একজন শিক্ষিত মুসলিম ইসলামী হিন্দু এবং খ্রিস্টান ঐতিহ্যলালিত ইউরোপীয় সংস্কৃতিকেও বোঝেন।’ পক্ষান্তরে জন্মসূত্রে হিন্দু বাঙালি তার নিজের গণ্ডিতে আটকে আছেন। প্রতিবেশীকে চেনার তার সুযোগও সীমিত।

রাজুর ঘোড়ায় চড়ে মিথের সেমেটিক বিশ্বটিকেও চেনার একটি বিস্তৃত সুযোগ হলো। রাজু কবি। তার ঘোড়ায় সওয়ার হলে পাঠক সম্পন্ন হবেন এই ভরসা দিতে পারি।

গ্রন্থে মোট কবিতার সংখ্যা ৩২। শেষে একটি রমন-রোদন পর্বের ৬টি সহ বত্রিশটি কবিতা। বিলের জলে পদ্মটি ফুটেছে। সাদা। শালগাছের কাছে শোনা প্রথম গল্পটির নাম, কবিতায়, চন্দ্রপ্রভা। উপচে পড়া চন্দ্রিমা। বাঙালি ভেনাস।

রাজু এখান থেকেই যাত্রা শুরু করেছেন। জীবন শয্যায় ছড়িয়ে। অন্ধকারে। কালের ভায়োলিনে নবজন্মের বীজ রুইছেন সে তিমিরে।

অমৃতবিষের পেয়ালা তুলে দিচ্ছেন চন্দ্রপ্রভাকে।

এক চুমুক পাঠকেরও প্রাপ্য।

কবি শুরু করেছেন—

‘চঙ্গা মই সেতু! সেতু বুনি—সেতু;

সেতু বুনতে বুনতে মহাকাশে ভেসে চলি

অনন্তের অন্ত—আমি, তুমি, ম্যাজিক মাকড়;

বুনে চলি, বুনে চলি এ প্রাণ! এ হলো তুমি-আমি

বুনে চলি ডাবল হেলিক্স; বুনে চলি জেনেটিক বয়ান

বুনে চলি তথ্য স্বয়ং—’

এই কবিতাতেই আর এক স্তবক পরে কবি রাজু, আমাদের গাইড, বলছেন—এই সেতু ডানা মেলেছে এক প্রাচীন সাগরে। জলে। এ প্রাণ স্বয়ং খোদা। এ সেতু স্বয়ম্ভু। বর্ণনা করছেন—

‘পিতার শরীর ছেড়ে যেমত জীবন ছুঁত এসিড বৃষ্টির রাতে—ফেলপিয়ন টিউব ধরে—দিয়েছিনু দৌড়

জন্মপূর্ব সব সহজাতক হারিয়ে—’

রাজু ডাবল হেলিক্স প্রোটিনের ভাষায় জীবনের বিজয়স্মারক চিনছেন। চেনাচ্ছেন। তিনি পথভোলা পথিক নন। কিন্তু ভোলার পথিক। চঙ্গা শব্দটি ভোলা অঞ্চলের। বাংলাদেশের বৃহত্তম ব-দ্বীপ। চঙ্গা অর্থ মই। জীবনের সুতোয় বুনলে নমনীয়। আপাত ভঙ্গুর। কিন্তু টানটান। বুননের পরম্পরা জীবন। রাজুর সফর জীবনের মিথে ও বিজ্ঞানে ব্যপ্ত।

সব কটি কবিতায় আপাতত আবার থামছি না।আবার বলছি। কারণ বারবার পাঠ ও পুনঃপাঠে আমার মতো করে কিছু তো বুঝেছি! ‘প্রভু’ কবিতায় কবি যখন শুরুই করছেন—মানুষ এক আসন্ন চিৎকার, বুঝে যাই রাজু পেতে চাইছেন প্রার্থনার ভাষা। শৈশব পার হয়ে পরের কবিতা ‘মোম’-এ তিনি আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন বাইসন-গুহা-বনপ্রান্তর থেকে দীর্ঘ কৃষিভূমি পেরিয়ে এক প্রাচীন নগরে।দেবতারা সঙ্গে ছিলেন একদিন।

দেবতারা ফেলে গিয়েছেন।মুঠোভরা সামান্য উত্তাপে মোম গলে যাচ্ছে।

‘ও মোম, ও গলে যাচ্ছ যে মোম

আমি এক প্রাচীন শামান’

শামান শব্দটির একটু টীকা প্রয়োজন। সাইবেরিয়া মাঞ্চুরিয়ার আদিম জনগোষ্ঠীর প্রকৃত ও অপ্রকৃত,লৌকিক ও অলৌকিকের সেতুটিতে যারা আরোগ্য দিতেন, দিতেন বরাভয় তারাই শামান। এই আদলে আমাদের আশপাশের অতীত ও বর্তমানের ঝাড়ফুঁক, মন্ত্রতন্ত্র, ওঝাকে চিনুন।

এবার ‘মিথের ঘোড়া’।

ঘোড়াটি এতোক্ষণ হাঁটছিল। খুরে খুরে। পায়ে পায়ে আপনি হাঁটছিলেন। এবার দৌড়তে হবে। কবির ভাষায়

‘দৌড়চ্ছে মিথের ঘোড়া

নিউরনে নিউরনে খুরের আওয়াজ

নড়ে ওঠে মৃতের হাত পা;

আজন্ম জীবন পায়নি যারা।’

চোখ পাতুন নিউরন শব্দটিতে। তারপর প্রত্যক্ষ করুন বালুঝড়। এশিয়ায়। আফ্রিকায়।

কবির আর্তিটি—

‘ও তান্ত্রিক, ওগো বিশেষণযুক্ত পুঁজির ঈশ্বর

দেখ, মরে যাচ্ছে কত কত মৃতদেহ

মরে যাচ্ছে কত কত কাস্টমার!’

মরে যাচ্ছে কত কত মৃতদেহ। মরার পরেও? কাস্টমার কথাটির প্রয়োগ মোক্ষম। পণ্যবিশ্বে।

তো ভাবুন দু’একটি কবিতা টপকে, সময়ের উল্টোপথে ঊষার সময়ে যাবো ফের। ঈশ্বরের কাছে যাব। শূন্যে যাব। রাজুর ঘোড়ায়। আপাতত গল্পের মাদকে যাই। ‘গল্পমাদক’ কবিতায় যাই। এই কবিতায় আবার একটি পলিনেশিয় মিথ। নিউজিল্যান্ডের মাওয়ি উপকথা। কাহিনিটি পাঠক খুঁজে পেতে বিস্তৃত পড়ুন। মাওরি পুরাণে মানুষের আদি পিতা তু। যুদ্ধ ও কৃষির দেবতা। তারই বংশধারায় তারাঙ্গা আর মাকেয়াতুতার মিলনে জন্ম মাওরির। শিশুটি

পূর্ণাঙ্গ নয়। অস্বাভাবিক। তাই তারাঙ্গা তাকে নিক্ষেপ করল সমুদ্রের পানিতে।তরঙ্গে। রাখে রাঙ্গা মারে কে? রাঙ্গা সমুদ্রের দেবতা। যুদ্ধ ও চাষাবাদের দেবতা। মানুষ তারই বংশধারা। মাওয়ি যুবক হলো। মিলিত হলো পরিবারের আরও চার অগ্রজ ভায়ের সঙ্গে। মায়ের সঙ্গে।

গল্পের শেষে পায়রার ছদ্মবেশে মায়ের পায়ে পায়ে মাওরি পৌঁছায় পাতালে। দেখা পায় পিতা মাকেয়াতুতার। মানুষ তখনো মৃত্যু কী জানত না।মিলন উৎসবে, যজ্ঞে ভুল একটি মন্ত্রপাঠের পরিণতিতে মানুষ হলো মরণশীল। দেবত্বের অধিকার রয়ে গেল।

সংক্ষেপেই বললাম। রাজু তার ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে আরও অনেক শব্দের আড়ালে মিথের ইশারা দিয়েছেন।

আমি কৌতূহল উসকে দিলাম।পাঠক খুঁজে নেবেন।

আমি সবগুলোর খোসা ছাড়াব না।তবে ‘ইলোহাম’ নিয়ে দুচার  কথা না বললেই নয়।

খু্ঁজে দেখলাম ইলহাম, রাজুর বয়ানে ইলোহাম, হলো চিন্তা ও চেষ্টা ছাড়াই কোন কথার উদ্রেক। স্বপ্নে পাওয়া। আল্লাহ বা শয়তান যে কারো। কবিতা তো সেইরকমই। শ্রমের ফসল?

নাকি স্বতোৎসারিত। উৎসার কেবল নয়। উত্তরাধিকারজাত। যে কথা শুরুতে বলেছি। এই মিথগুলো রাজু এশিয়া মাইনর থেকে, আফ্রিকা থেকে, নিনেভ ও ব্যাবিলন থেকে, কেনান প্রান্তর এমনকি পলিনেশীয় ভূমি থেকে আমাদের বাংলার মাটি ও আকাশে ছড়িয়ে দিলেন। ঘোড়ার বদৌলতে। এই কবিতায় এনুমা এলিশ উত্থাপিত। এনুমা এলিশ। ব্যাবিলনীয় সৃষ্টিগাথা। ঘোড়াটি দাঁড়াক। পাঠক এই অবসরে ঘুরে তো দেখুন মিথ, সংলগ্ন অতীত।

রাজু এইভাবেই কবিতার পরতে পরতে বুনেছেন, আবারও কিছু কিছু কবিতা টপকে যাচ্ছি,

পুনরুত্থান পর্ব, মুদ্রার গান, কানামঙ্গল, মৎস্যজকুমারী মায় একটি বিড়াল সংলাপও—

‘ভাজা মাছ, ভালো আছো? সুসভ্য বিড়াল আমি

আমরা তো সকলেই মাছভাজা গো—’

রাজুর বয়ানে আমাদের সামূহিক স্বীকারোক্তি বটে!

ভাজা মাছ উল্টে খেত গিয়ে লোভ হলো একটি অন্তত কবিতার কাঠামো ছানবিন করি। বেছে নিচ্ছি প্রশ্ন নাম্বার ২০১৬। পাঁচ পাঁচ মাত্রার পর্বে মাত্রাবৃত্ত বা চার চার মাত্রার স্বরবৃত্ত। কিন্তু টানা রাস্তার মত বিছানো রয়েছে। কবিতাটি মর্মস্পর্শী আরও যে কারণে তা হলো এটি ধর্ষণে নিহত পৃথিবীর সমস্ত তনুদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। শব্দের পায়ে পায়ে আমরা গদ্য পাঠ করি। কবিতা পড়ি পর্বে পর্বে।

পর্বের পাঠসংকেত সহ কবিতাটি পেশ করছি, যাতে বোঝা যাবে কবির নির্মাণ-দক্ষতাও।

ডাঙ্গুলির/ মাঠ পেরিয়ে/ঝোপ-ঝাড়ের/ মাঝে—দাঁড়িয়ে/ ছিল একটি/ প্রশ্ন—তারে/ দেখেছো!

প্রশ্ন, তা সে/ রক্ত মাখা/ বীর্য মাখা/ বমিজাগানো/ দুর্গন্ধ/ লালায় ভেজা/ দেখেছো!

গায়েবী হাটে/ যত হাটুরে/ কইতে ছিল/ সে জলপাই/ মাকরশার/ সুতোয় নাকি/ প্যাঁচানো

সে এক সুতা/ বটে বহুৎ/ তেলেশমতি/ বিজলী সুতা/ অন্তত এ/ গরীব গাঁয়ে/ নাকি হে!

তাই তো বলি/ প্রশ্নখানা/এমন কেন/ক্ষণেক যায়/ দেখা আবার/ ক্ষণেক যায়/ মিলিয়ে!

তা এ প্রশ্ন/ মহাকালের/ হাজার লাখ/ প্রশ্নদের/ সাথে কিন্তু/ দাঁড়িয়ে রবে—/ জনাব!

শুধু চোখের/ প্রতীক্ষায়—

এই পাঠের পর রমন-রোদন পর্ব। শেষ নোট। রোদনসম্ভূত। কবি না বলার কথার হয়ে কইছেন—

‘ক্রিয়ার বিভক্তিগুলো খসে যাচ্ছিল, যেন তা বকুল,

তার নিঃশব্দ পতন যেন বুঝে নিতে হবে,

বুঝে নিতে হবে অনুচ্চারিত শব্দাংশ।’

যেন তা বকুল! স্মৃতির গহিন থেকে আরও যে বকুল উঠে এলো—ওমা এ যে ঝরা বকুল!

পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী?

তো পাঠক পুনঃপাঠে যান। তন্ন তন্ন পাঠে।

মিথের ঘোড়া/ রাজু আহমেদ মামুন/ প্রকাশক : চৈতন্য/ প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২০/ দাম ১৩৫ টাকা/





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: