দিল্লির অবৈধ বাজারে রেমডেসিভির, বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে

ভারতে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় ব্যবহৃত রেমডেসিভির ও টোসিলিজুমাব ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অবৈধ ব্যবসায়ীরা ওষুধগুলো নিজেদের দখলে নিয়ে কৃত্রিম এ সংকট তৈরি করেছে। করোনা আক্রান্ত রোগীর স্বজনরা তাদের কাছ থেকে চড়া মূল্যে ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চিত্র।

অভিনব শর্মা নামে এক ব্যক্তি বিবিসিকে জানান, অনেক জ্বর আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে তার চাচাকে দিল্লির হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরীক্ষায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসকরা তার স্বজনদেরকে রেমডেসিভির ওষুধটি সংগ্রহ করতে বলেন। অভিনব জানান, রেমডেসিভির খুঁজতে গিয়ে একে অসাধ্য কাজ বলে মনে হলো। কোথাও পাওয়া গেলো না এ ওষুধ। এদিকে চাচার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে লাগলো, অভিনব লোকজনকে রেমডেসিভির সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ফোন করে যেতে থাকলেন।

‘আমার চোখ কান্নায় ভরে গেলো। একদিকে চাচা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন আর অন্যদিকে তার জীবন রক্ষা করতে পারে এমন ওষুধ সংগ্রহ করার জন্য আমি রীতিমতো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।’ বলেন অভিনব। জানান, অনেকজনকে ফোন দেওয়ার পর অবশেষে তিনি ওষুধের সন্ধান পান। তবে এ ওষুধ কেনার জন্য তাকে ৭ গুণ বেশি দাম দিতে হয়েছে।

এ ব্যাপারে অভিনবের অভিমত, ‘সত্যিকার অর্থে ওই পরিমাণ দাম পরিশোধ করতে আমি রাজি ছিলাম এবং সামর্থ্যও আছে। কিন্তু আমি ভাবছিলাম দরিদ্রদের কথা, যারা এতো দাম দিয়ে এ ওষুধ কিনতে পারবে না।’

একই ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হয়েছে দিল্লির আরও অনেক পরিবার। প্রিয়জনকে বাঁচানোর চেষ্টায় রেমডেসিভির কিনতে গিয়ে অনেকে জীবনের শেষ সঞ্চয়টুকু দিয়ে দিয়েছেন। অনেককে পুরাতন দিল্লির একটি ওষুধের মার্কেটে যেতে হয়েছে। ওই মার্কেটে কাজ করা মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন বিবিসির প্রতিনিধি। তারা দাবি করেন, যথাযথ দামেই তারা ওষুধ সরবরাহ করতে পারবেন। ওষুধের ব্যবসা করেন এমন এক ব্যক্তি বিবিসিরি প্রতিনিধিকে বলেন, ‘আমি আপনার জন্য তিনটি ভায়াল এনে দিতে পারব। তবে প্রত্যেকটির দাম পড়বে ৩০ হাজার রুপি করে। আর আপনাকে এখনই আসতে হবে।’

অথচ ভারতে রেমডেসিভিরের প্রত্যেকটি ভায়ালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৪০০ রুপি করে। আর প্রতিটি রোগীর জন্য পাঁচ থেকে ছয়টি ডোজের প্রয়োজন হয়। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আরেক ব্যক্তি তাদের কাছে প্রতি ভায়াল ৩৮ হাজার রুপি করে দাম চেয়েছেন।

করোনাভাইরাস আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য এখন পর্যন্ত কোনও অনুমোদিত ওষুধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কার্যকরী ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছে। এরই একটি হলো রেমডেসিভির। গিলিয়াড সায়েন্সেস-এর তৈরি এ ওষুধটি মূলত ইবোলার চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এতে সফলতা এসেছিলো খুবই কম। তবে বিভিন্ন পশুর শরীরে চালানো বেশ কয়েকটি পরীক্ষায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯, সার্স ও মার্সসহ করোনাভাইরাস সংক্রান্ত সংক্রমণ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় এ ওষুধ কার্যকর। করোনা আক্রান্তদের শরীরে রেমডেসিভিরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালিয়ে গিলিয়াড সায়েন্স দাবি করে, এই ওষুধ দ্রুত কাজ করছে। ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, রেমডেসিভির ওষুধটির সম্ভাবনা আছে। এরইমধ্যে বিভিন্ন দেশে করোনার চিকিৎসায় জরুরি প্রয়োজনে ওষুধটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

গিলিয়াড সায়েন্স ভারতের চারটি কোম্পানিকে এ ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে। এগুলো হলো-সিপলা, জুবিল্যান্ট লাইফ, হিটেরো ড্রাগস ও মাইলন। এরমধ্যে এখন পর্যন্ত হিটেরো কোম্পানি এ ওষুধ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, পাঁচটি রাজ্যে তারা ২০ হাজার ডোজ ওষুধ বিতরণ করেছেন। তবে কিভাবে এ ওষুধ অবৈধ বৗবসায়ীদের হাতে পৌঁছালো তা তারা নিশ্চিত নয়।

হিটেরোর বিক্রয়বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট সন্দ্বীপ শাস্ত্রী বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা আমাদের পরিবেশকদের কাছে এ ওষুধ দিইনি। নির্দেশনা মেনে হাসপাতালগুলোতে সরাসরি ভায়াল সরবরাহ করেছি।’ চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়ানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

ফার্মেসিগুলো বলছে, তাদের কাছেও ওষুধটি সরবরাহ করা হয় না। তাহলে কিভাবে পুরাতন দিল্লির ওষুধের বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে রেমডেসিভির?

ওষুধের দোকান মালিকদের সংগঠন অল ইন্ডিয়া কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্টস অ্যাসোসিয়েশন-এর মহাসচিব রাজিব সিংহাল কোনও দোকান মালিকের জড়িত থাকার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত আমাদের কোনও সদস্য এ কাজ করবে না। দেশে এখন জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা চলছে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কেউ অবৈধভাভে বিক্রি করছে বলে আমরা জানতে পারলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শুধু রেমডেসিভিরই নয়, ভারতে করোনার চিকিৎসায় ব্যবহৃত আরেক ওষুধ টোসিলিজুমাব-এরও সংকট তৈরি হয়েছে। এ ওষুধ আগে শুধু আর্থ্রাইটিসের রোগীদের চিকিৎসায় এ ওষুধ ব্যবহার করা হতো। সবসময়ই এর সরবরাহ সীমিত ছিল। একটেমরা নামে বিক্রি হওয়া এ ওষুধটি করোনা রোগীদের শরীরে কাজ করছে বলে দাবি করেছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল। তবে বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, এর কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি রোচে এর পক্ষ থেকে ভারতে ওষুধটি বিক্রি করে সিপলা। এগুলো পুরোপুরি আমদানি করা ওষুধ। খুব কম সময়ের মধ্যে এ ওষুধ লাগলে তা সংগ্রহ করা কঠিন।

এক রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করে বিবিসিকে বলেন, ‘আমি দিল্লিতে ৫০টি দোকানে ঘুরেছি। তারা সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ওষুধ জোগাড় করে দেবে। তবে প্রতি ডোজের জন্য দুই থেকে তিন গুণ বেশি দাম চাওয়া হয়েছিল। আমার খালার জন্য প্রয়োজনীয় ডোজ কিনতে আমার দুইদিন লেগেছিল।’

তবে সিপলার এক প্রতিনিধি অবৈধভাবে এ ওষুধ বিক্রি হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ‘কেউ যেন অতিরিক্ত মুনাফার জন্য এ ওষুধ ব্যবহার না করতে পারে তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি ডোজের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। আমরা এটা হতে দেব না।’





আরও পড়ূন বাংলা ট্রিবিউনে

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

%d bloggers like this: